প্রথম পাতা

শহরের তথ্য

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

বিবিধ প্রসঙ্গ

নভেম্বর ১৫, ২০১৪

 

জন্মসার্ধশতবর্ষে জ্ঞানতাপস আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল

সৌম্যকান্তি জানা


ঊনবিংশ শতাব্দির ষাটের দশক। বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল সময়। বাংলায় তখন বেগবতী “নবজাগরণ” স্রোতস্বিনী। দু-চার বছর আগে-পরে জন্ম নিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ-প্রফুল্লচন্দ্র-উপেন্দ্রকিশোর-নরেন্দ্রনাথ-রামেন্দ্রসুন্দর। ঠিক ঐ সময়েই উত্তর-কলকাতাতে ১৮৬৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী মহেন্দ্রনাথ শীল ও রাধারানী দেবীর দ্বিতীয় সন্তান ব্রজেন্দ্রনাথ শীল- যাঁর জ্ঞানপ্রতিভাকে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে প্রফুল্লচন্দ্র, সমকালীন সমস্ত বিদগ্ধ পন্ডিত মানুষ।

ব্রজেন্দ্রনাথ শীল বহুবিদ্যায় বিশারদ ছিলেন- শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, ধর্মতত্ব, সমাজতত্ত্ব, দর্শন, বিজ্ঞান, গণিত.... বহু বিষয়ে তিনি ছিলেন অসামান্য পন্ডিত। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের শ্রেষ্ঠ মৌলিক চিন্তাবিদ। তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রচারক। বিজ্ঞানের দর্শন ও তুলনামূলক ধর্মতত্বে তাঁর মতো পান্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা কোনও ভারতীয় আগে কখনও করেননি। যুক্তিবাদী মনন নিয়ে করেছেন বৈজ্ঞানীক অনুসন্ধান। গণিতে তিনি অত্যন্ত পন্ডিত ছিলেন বলে তিনিই প্রথম ভারতবর্ষে তুলনামূলক সাহিত্য ও ধর্মদর্শন বিচার এবং দর্শন আলোচনায় গণিতের সূত্র প্রয়োগ করেন। প্রাচীন ও আধুনিক মিলিয়ে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের ১০টি ভাষায় তাঁর বুৎপত্তি ছিল।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘তাঁহার ন্যায় পণ্ডিত লোক বহু শত বৎসর ভারতবর্ষে জন্মে নাই এবং শীঘ্রই যে জন্মিবে তাহাও আমার মনে হয় না৷‌’ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত জানিয়েছিলেন, ‘সক্রেতিস বংশের শেষ কুলপ্রদীপ’৷‌ ‘চলন্ত বিশ্বকোষ’-এর মত বিশেষণে ভূষিত করেছিলেন বিনয় সরকার। ব্রজেন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “‘সর্ববিদ্যাবিশারদ’ বলিয়া আখ্যা যদি কাহাকেও নিঃসংশয়ে দেওয়া যায় তবে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ তাহার উপযুক্ততম পাত্র।” (আনন্দবাজার পত্রিকা, ৪ ডিসেম্বর, ১৯৩৮) ১৯৩৫ সালে তিনি ৭২ বছর বয়সে পদার্পণ করলে ভারতীয় দর্শন কংগ্রেস এক সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করে। এ উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ‘আচার্য শ্রীযুক্ত ব্রজেন্দ্রনাথ শীল সুহৃদবরেষু’ শীর্ষক এক প্রশস্তিবাণী প্রেরণ করেন। কবিগুরুর সেই প্রশস্তিবাণীতে রয়েছে-

"জ্ঞানের দুর্গম উর্ধ্বে উঠেছে সমুচ্চ মহিমায়
যাত্রী তুমি, যেথা প্রসারিত তব দৃষ্টির সীমায়
সাধনা-শিখরশ্রেণী............"

সাধে কি আর তাঁকে বলা হত "চলমান বিশ্ববিদ্যালয়! ব্রজেন্দ্রনাথের শৈশব কেটেছে খুব কষ্টে। শৈশবেই তিনি মাতৃহারা হন। কিন্তু হঠাৎ বাবার মৃত্যু দাদা ও দুই বোন সহ ব্রজেন্দ্রনাথকে ঠেলে দেয় চরম অসহায়তার মধ্যে। এই অবস্থায় তাঁরা আশ্রয় নেন মাতুলালয়ে। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে তাঁদের মাতামহ মারা যাওয়ায় পুণরায় অনাথ হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে ব্রজেন্দ্রনাথের দাদা রাজেন্দ্রনাথ ভাইবোনদের ভরণপোষনের দায়িত্ব নিতে পড়াশুনা ছেড়ে অতি সাধারণ একটা চাকরিতে যোগদান করেন। এভাবে রাজেন্দ্রনাথ ভাইবোনদের জন্য ত্যাগ স্বীকার না করলে হয়তো এই ব্রজেন্দ্রনাথকে দেশবাসী কোনওদিনই পেত না।

পাঠশালার পড়া শেষ করে ব্রজেন্দ্রনাথ ভর্তি হলেন জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইন্সটিটিউশনে।এখান থেকেই ১৮৭৮ সালে তিনি প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেন। তারপর তিনি ভর্তি হন ওই স্কুলের কলেজ বিভাগে (বর্তমানে স্কটিশ চার্চ কলেজ)। যথারীতি এখান থেকে ১৮৮০ সালে প্রথম বিভাগে এফ.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। তারপর ওই কলেজেই গণিতে অনার্স নিয়ে পড়া শুরু করলেন। ১৮৮৩ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রথম বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে নিজের কলেজেই অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ। এমন বিচিত্র ঘটনা আমাদের দেশে আগে বা পরে আর কখনও ঘটেনি। এর পরের বছর কলেজের অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেস্টির অনুরোধে তিনি দর্শন বিষয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ. পরীক্ষায় বসেন এবং প্রথম বিভাগে পাস করেন। তবে এই এম.এ. পরীক্ষা ঘিরে একটা বিরল কাহিনি আছে, যা না উল্লেখ করলে এই প্রবন্ধ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ব্রজেন্দ্রনাথ গণিত ও দর্শন দুটি বিষয়েই ছিলেন তুখোড়। কিন্তু তিনি গণিত না দর্শন কীসে এম.এ. পরীক্ষা দেবেন তা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে টানাপোড়েন চলেছিল। তাঁর গণিত শিক্ষক গৌরীশংকর দে চেয়েছিলেন প্রিয় ছাত্র ব্রজেন্দ্রনাথ গণিতে এম.এ. করুন। ব্রজেন্দ্রনাথ নিজেও গণিতে এম.এ. পরীক্ষা দিতে পক্ষপাতী ছিলেন, কারণ তাঁর স্নাতক ডিগ্রি ছিল গণিতে। এই বিতর্ক যখন চলছে ব্রজেন্দ্রনাথ অবশ্য তখন মিউজিয়মে বসে বায়োলজি ও অ্যানথ্রোপলজি পড়তে মত্ত! যাইহোক শেষে অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেস্টির অনুরোধে দর্শনে এম এ পরীক্ষায় বসলেন। মোট তিনটি পেপার। প্রতি পেপারের পরীক্ষায় ৫টি প্রশ্নের উত্তর লিখতে হত। তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ম ছিল, তিনটি পেপারের কোনও একটিতে ২৫-এর কম পেলে তা এগ্রিগেটে যোগ হবে না। তবে পাস নম্বর না পেলেও কমপক্ষে ২৫ পেলে তা মোট নম্বরের সাথে যোগ হবে এবং বাকি দুটি পেপারের নম্বর মিলিয়ে মোট পাস নম্বর পেতে হবে। ব্রজেন্দ্রনাথ একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। সারা বছর দর্শন তো পড়েননি, পড়েছেন জীববিদ্যা আর নৃবিদ্যা। হাতে সময় মাত্র একমাস। থার্ড ক্লাস পেলে তা হবে লজ্জার ব্যাপার! ব্রজেন্দ্রনাথ ওই এক মাসই পড়ে পরীক্ষায় বসলেন। প্রথম পেপারে ব্রজেন্দ্রনাথ দেখলেন সব প্রশ্নের উত্তরই জানা। কিন্তু পুরো ৩ ঘন্টা ধরে ব্রজেন্দ্রনাথ মাত্র একটি প্রশ্নের উত্তরই লিখলেন। ব্রজেন্দ্রনাথতো বটেই, বন্ধুরা সবাই ধরে নিল নির্ঘাত ফেল! বন্ধুরা ও শিক্ষকরা বললেন, "বাকিগুলো ভালো করে দাও।" ব্রজেন্দ্রনাথ মনে মনে ঠিক করলেন, পরের পরীক্ষাগুলোতে নির্ধারিত সময়ে পাঁচ’টি প্রশ্নের উত্তরই দেবেন। কিন্তু অবাক কান্ড! ব্রজেন্দ্রনাথ প্রতিটি পেপারেই তিন ঘন্টা ধরে মাত্র একটি করে প্রশ্নের উত্তর লিখলেন। সুতরাং ফেল কে আটকায়! কিন্তু পরীক্ষকরা উত্তরপত্র দেখে অবাক! এ তো রীতিমতো থিসিস পেপার! এই খাতা দেখে মূল্যায়ন করার যোগ্যতা অধ্যাপকদেরই নেই! সেনেটে এ নিয়ে জরুরি সভা বসল। কী করা যায়! সিদ্ধান্ত হল, একটা প্রশ্নের উত্তরে যা নম্বর পাবে, বাকি অলিখিত প্রশ্নের জন্য তার শতাংশের হারে নম্বর ধরে দেওয়া হবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটে এমন সিদ্ধান্ত ওটাই প্রথম ও শেষ। রেজাল্ট বেরতে দেখা গেল ব্রজেন্দ্রনাথই একমাত্র ছাত্র যিনি ওই বছর দর্শনে প্রথম শ্রেণিতে পাস করেছেন!!! ভাবা যায়!!!!

যাইহোক, এম.এ. পাস করার পরের বছর মাত্র ২০ বছরের ব্রজেন্দ্রনাথ ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে সিটি কলেজে যোগ দিলেন। এই সময় ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলি, কিটস, বায়রনের সাহিত্যজগতে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন ব্রজেন্দ্রনাথ। ওই বছরই (১৮৮৪) ব্রজেন্দ্রনাথ আসামনিবাসী জয়গোপাল রক্ষিতের জ্যেষ্ঠা কন্যা ইন্দুমতী দেবীর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। কিন্তু ব্রজেন্দ্রনাথের দুর্ভাগ্য, মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিন পুত্র ও এক কন্যাকে রেখে ইন্দুমতী দেবী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। স্ত্রীর মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই ব্রজেন্দ্রনাথকে কনিষ্ঠ পুত্রের মৃত্যুশোকও ভোগ করতে হয়।

যাইহোক, আর্থিকভাবে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যলাভের উদ্দেশ্যে ব্রজেন্দ্রনাথ ১৮৮৫ সালে নাগপুরের মরিস মেমোরিয়াল কলেজে যোগদান করেন। কিছুদিন পরে তিনি এই কলেজের অধ্যক্ষ হন। এত কম বয়সে দেশে কোনও কলেজের অধ্যক্ষ হওয়া- এটাও ব্রজেন্দ্রনাথের একটা রেকর্ড। ১৮৮৭ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে বাংলায় ফিরে আসেন ব্রজেন্দ্রনাথ। ১৮৯৭ সালে কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়নের অনুরোধে কোচবিহার ভিক্টোরিয়া কলেজে (বর্তমানে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল কলেজ) অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করেন। তিনিই হলেন ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রথম ভারতীয় অধ্যক্ষ। ব্রজেন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়া কলেজকে কেন্দ্র করে কোচবিহার রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্ম দেন। ভিক্টোরিয়া কলেজে দীর্ঘ ১৫ বছর অধ্যক্ষ থাকাকালীন তিনি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনাসভায় অংশগ্রহণ করেন। অবশ্য তাঁর এই বিদেশযাত্রার জন্য অর্থ জুগিয়েছিলেন কোচবিহারের মহারাজা।

১৮৯৯ সালের ১৫ অক্টোবর ব্রজেন্দ্রনাথ রোমে প্রাচ্যবিদ্যার ওপর এক আন্তর্জাতিক আলোচনাসভায় (Congress International Des Orientalists) অংশগ্রহণ করেন। এখানে তিনি চারটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। প্রথম প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল “Comparative Studies in Vaishnavism and Christianity”। এই প্রবন্ধে তিনি ‘ইতিহাসের দর্শন’ ও ‘ঐতিহাসিক তুলনামূলক পদ্ধতি’ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেন। তিনি বিশ্বজনীন সংস্কৃতির উপর মৌলিক কিছু ধারণার কথা বলেন যা পাশ্চাত্যের বিদ্দ্বজ্জনদের কাছে অজানা ছিল। ভারতীয় দর্শনের উপর ব্রজেন্দ্রনাথের এই অসামান্য পান্ডিত্যপূর্ণ ভাষনের পর ব্রজেন্দ্রনাথের খ্যাতি সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯১১ সালে ব্রজেন্দ্রনাথ প্রথম বিশ্বজাতি কংগ্রেসে (The First Universal Race Congress) বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে লন্ডনে যান। তিনি “Meaning of Race, Tribe and Nation” শীর্ষক আলোচনাপত্রের উপর উদ্বোধনী ভাষণ দেন। তাঁর প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘Race Origin’। এই প্রবন্ধে তিনি জাতিতত্ব, নৃতত্ত্ব, প্রাণিবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, ইতিহাস, অর্থনীতি ও দর্শনের আলোকে মানবজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন ধারণা তুলে ধরেন।

১৯১১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক ও নীতিবিজ্ঞান বিষয়ে রাজা পঞ্চম জর্জ নামাঙ্কিত (বর্তমানে Brajendranath Seal Professor of Mental and Moral Science) একটি চেয়ার প্রতিষ্ঠিত হয়। উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে ১৯১৩ সালে এই চেয়ারে প্রথম অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন ব্রজেন্দ্রনাথ। ১৯২০ পর্যন্ত তিনি এই চেয়ার অলংকৃত করেছেন। ১৯১৭ সালে ভারতবর্ষে শিক্ষা-সংস্কারের উদ্দেশ্যে মাইকেল স্যাডলারের সভাপতিত্বে যে কমিশন (স্যাডলার কমিশন) গঠিত হয় ব্রজেন্দ্রনাথ ছিলেন তার অন্যতম সদস্য এবং ১৯১৯ সালে এই কমিশন যে পাহাড়প্রমাণ রিপোর্ট পেশ করে তার অধিকাংশ অধ্যায়ই ছিল ব্রজেন্দ্রনাথের লেখা।

১৯২১ সালে ব্রজেন্দ্রনাথ মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। উপাচার্য থাকাকালীন ব্রজেন্দ্রনাথ মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রশাসনিক ও শিক্ষার মানের দিক থেকে অনেক উঁচুতে তুলে ধরেন। মহীশূররাজের শাসন সংস্কার পরিষদের সভাপতি হিসেবে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও তিনি কিছুকাল সামলান।

১৯১০ সালে ‘Mechanical, Physical and Chemical Theories of Ancient Hindus’ শীর্ষক থিসিস রচনা করে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯২১ সালে তাঁকে ডি এসসি ডিগ্রি দিয়ে সম্মানিত করা হয়। তবে সবচেয়ে বড় সম্মান হিসেবে ব্রিটিশ সিরকার তাঁকে নাইটহুড (স্যার) খেতাব দেয়। এছাড়া মহীশূরে অসামান্য অবদানের জন্য মহীশূররাজ তাঁকে ১৯৩০ সালে “রাজতন্ত্রপ্রবীণ” সম্মানে ভূষিত করেন।

তাঁর নানা বিষয়ে রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: গণিতের উপর মহাগ্রন্থ “A Memoir on the Co-efficient of Numbers: A Chapter on the Theory of Numbers” (1891); ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে “Neo-Romantic Movement in Bengali Literature” (1890-91); ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে “A Comparative Study of Christianity and Vaishnavism” (1899); সমালোচনা সাহিত্য বিষয়ক “New Essays in Criticism” (1903); প্রাচীন ভারতে রসায়ন চর্চা বিষয়ক “Introduction to Hindu Chemistry” (1911); প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে “Positive Sciences of the Ancient Hindus” (1915); নৃতত্ত্ব বিষয়ক “Race-Origin” (1911); ইংরেজিতে লেখা মহাকাব্য “The Quest Eternal” (1936), “The Gita: A synthetic Interpretation”, “The Equation of Digits: Being an Elementary Application of a Principle of Numerical Grouping to the Solution of the Numerical Equations” ইত্যাদি।

“Positive Sciences of the Ancient Hindus” গ্রন্থে তিনি বিজ্ঞান চর্চায় হিন্দুদের সাথে সাথে জৈন ও বৌদ্ধদের অবদানের কথা তুলে ধরেছেন। ১৮৯০-৯১ সালে The Calcutta Review পত্রিকায় প্রকাশিত হয় “Neo-Romantic Movement in Bengali Literature”। এই লেখার মধ্যে ব্রজেন্দ্রনাথের জ্ঞানের গভীরতা, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণী ক্ষমতা, বুদ্ধিমিত্তার দীপ্তি ও অসাধারণ বিচারশক্তির নমুনা দেখা যায়। তুলনামূলক সাহিত্যের এক অসামান্য ব্যাখ্যাতা হিসেবে তিনি এই লেখায় নিজেকে উপস্থাপিত করেন। ব্রজেন্দ্রনাথের লেখা “The Quest Eternal” হল মানব সভ্যতার কাল ও ঘটনাবলী উল্লেখ করে দার্শনিক মতবাদসমূহের এক কাব্যাকাব্য। এখানে উল্লেখ্য “The Quest Eternal” মহাকাব্যটি ব্রজেন্দ্রনাথ শেষ বয়সে ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে রোগশয্যায় শুয়ে ও প্রায় দৃষ্টিহীন অবস্থায় লিখেছিলেন। অনেকেই জানেন না, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘হিন্দু রসায়নশাস্ত্রের ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রথম দুটি অধ্যায় আচার্য শীলের লেখা।

ব্রজেন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন দর্শন ও বিজ্ঞান হল পরষ্পর সম্পর্কযুক্ত বিষয়। আর তাই তিনি এই দুই বিষয়ে চর্চাও করেছেন বিস্তর। তিনি মনুষ্যেতর প্রাণী, শিশু ও অস্বাভাবিক মনস্তত্ব নিয়ে ব্যাপক পড়াশুনা করেছেন। সেই সময়ের অত্যাধুনিক বিষয় পরীক্ষামূলক মনস্তত্ব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি ভূতত্ব ও প্রত্নতত্বের সাহায্যে পৃথিবীর বয়স নির্ণয়ে সচেষ্ট ছিলেন। বিবিধ বষয়ে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। ‘ভারতীয় স্থপতি শিল্প’, ‘ওড়িশার মন্দিরগাত্রের চিত্র’, ‘শিক্ষাবিস্তার’- এমনই নানা বিষয়ে তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁকে ভারতে রাশিবিজ্ঞানের জনকও বলা যেতে পারে। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ যাঁকে দেখে রাশিবিজ্ঞানে উৎসাহী হন তিনি হলেন আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। রবীন্দ্রনাথ সহ সমকালীন অন্য বাঙালি সাহিত্যিকদের সৃষ্টিকে প্রথম পাশ্চাত্যের সাথে পরিচিত করান যিনি তিনি আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার অনেক আগে ১৮৯১ সালেই ব্রজেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। ব্রজেন্দ্রনাথের সাথে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল অতি প্রগাঢ়। তাঁর প্রতি রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধাও ছিল অপরিসীম। ১৯২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে তিনি বিশ্বভারতীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। সভাপতি বরণের সময় রবীন্দ্রনাথ বলেন-

“..... আমি আচার্য শীল মহাশয়কে সকলের সম্মতিক্রমে বরণ করেছি; তিনি সভাপতির আসন গ্রহণ করে কর্ম সম্পন্ন করুন, বিশ্বের প্রতিনিধি রূপে আমাদের হাত থেকে একে গ্রহণ করে বিশ্বের সম্মুখে স্থাপন করুন। তিনি এ বিষয়ে যেমন করে বুঝবেন তেমন আর কেউ পারবেন না। তিনি উদার দৃষ্টিতে জ্ঞানরাজ্যকে দেখেছেন। কেবল অসাধারণ পাণ্ডিত্য থাকলেই তা হতে পারে না, কারণ অনেক সময়ে পাণ্ডিত্যের দ্বারা ভেদবুদ্ধি ঘটে। কিন্তু তিনি আত্মিক দৃষ্টিতে জ্ঞানরাজ্যের ভিতরের ঐক্যকে গ্রহণ করেছেন। আজকের দিনে তাঁর চেয়ে বিশ্বভারতীকে গ্রহণ করবার যোগ্য আর কেউ নেই। আনন্দের সহিত তাঁর হাতে একে সমর্পণ করছি।......” রবীন্দ্রনাথ আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলকে বিশ্বভারতীর প্রথম আচার্য হিসেবে মনোনীত করেন।

আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথের সাথে স্বামী বিবেকানন্দেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিবেকানন্দ তখন নরেন্দ্রনাথ। জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইন্সটিটিউশনে ব্রজেন্দ্রনাথের থেকে এক ক্লাস নিচে পড়তেন নরেন্দ্রনাথ। যদিও ব্রজেন্দ্রনাথের চেয়ে এক বছরের বড়ো ছিলেন নরেন্দ্রনাথ। তাঁরা এইসময় ব্রাহ্মসমাজের সভায় নিয়মিত হাজির হতেন। এই সময় ওঁরা দুজনে একসাথে জন স্টুয়ার্ট মিল, অগাস্তে কোমতে, হারবার্ট স্পেনসার, হেগেল প্রমুখের বিশ্বাস, অগ্রগতি ও আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টির জটিলতাগুলি উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন। পরবর্তীকালে ভগিনি নিবেদিতার অনুরোধে ব্রজেন্দ্রনাথ স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে ছাত্রজীবনের একটি স্মৃতিকথা রচনা করেন। এটি ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকায় ১৯০৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয়।

১৯৩৮ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের এই বিরল প্রতিভাধর ঋষিতুল্য মানুষটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০১৪ হল আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথের ১৫০ তম জন্মবর্ষ। আসুন, ভারতবর্ষের এই মহান জ্ঞানতাপসকে নিয়ে আমরা কিছু চর্চা করে তাঁকে সম্মান জানাই।

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ লেখাটি আগে 'গণশক্তি' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।


লেখক পরিচিত - সৌম্যকান্তি জানা - বেড়ে ওঠা, স্কুলের পড়াশুনা কাকদ্বীপে। লেখালেখি,গানবাজনার চর্চা শৈশব থেকেই। ১৯৯২ সালে উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। বর্তমানে কাকদ্বীপের কাছে একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের একজন সক্রিয় সংগঠক। ছড়া, কবিতা, গল্প, নাটিকা, প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত প্রথম সারির বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।