অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


বিবিধ প্রসঙ্গ

নভেম্বর ১, ২০১৭

 

পুনর্জন্ম

সুবীণ দাস

এবারের যে জাহাজটির আমি চিফ ইঞ্জিনিয়ার সেটা হল Multi purpose vessel, অর্থাৎ বিভিন্ন ধরণের পণ্য বইবার জন্য বানানো হয়েছে। ইউরোপের দুটি দেশের বন্দর থেকে ৪৮ হাজার মে: টন পণ্য বোঝাই করে জাহাজ ভাসল সমুদ্রে। জাহাজটির গন্তব্য পশ্চিম আফ্রিকার এঙ্গোলা, কঙ্গো, সিয়েরা লিয়ন ও আইভরি কোস্ট। যাত্রা পথ প্রায় ১১ দিনের। প্রথম এঙ্গোলার বন্দরে ভিড়ল জাহাজ। সেখানে ২৫ হাজার মে: টন পণ্য নামিয়ে আবার ভেসে পড়লাম কঙ্গোর উদ্দেশে। এঙ্গোলা বন্দরে থাকা কালীন বেশ কয়েকটি মৃতদেহ ভেসে যেতে দেখতে পেলাম জাহাজের পাশ দিয়ে। সেখানে তখন বিদ্রোহী ও সরকারি সৈনিকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে।

এবারের গন্তব্য কঙ্গো নদীতে অবস্থিত বোমা (Boma) ও মাটা-ডি(Matadi) বন্দর। যে সময়কার কথা বলতে বসেছি, সেই সময়ে ওই দেশটির ও তুমুল গৃহ যুদ্ধে টালমাটাল অবস্থা। জাহাজ থেকে নেমে শহরে যাওয়ার ছাড়পত্র নেই বিদেশীদের। তারই মধ্যে সরকারি সেনা বাহিনীর ২৪ ঘণ্টা পাহারায় আমাদের জাহাজের পণ্য নামানোর কাজ সুরু হল। শহরে না আছে বিদ্যুৎ, না আছে পানীয় জল। মোবাইল ফোনের সব যোগাযোগ ছিন্ন। বিদ্রোহীরা ধ্বংস করে দিয়েছে এই সব ব্যবস্থা।

আজকাল প্রায় কোনও দেশই বন্দরে থাকার সময়ে জাহাজের বাইরের লোহার পাতগুলোর জং ছাড়িয়ে রঙের প্রলেপ দেওয়ার কাজ করার অনুমতি দেয়না। তার প্রধান কারণ রঙে যে সিসা থাকে তা জলে পড়ে বন্দরের জল বিষাক্ত করে তুলতে পারে। কঙ্গোর বন্দরগুলিতে দেখা গেল সে সব নিয়মকানুনের বালাই নেই। তাই মহানন্দে চিফ অফিসার তার সৈন্য সামন্ত নিয়ে নেমে পড়ল জাহাজের বাইরের দিকের লোহার পাতগুলোর শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে। জাহাজের বাইরে ঝুলন্ত তক্তার ওপরে দাঁড়িয়ে রং করার কাজটি খুবই বিপদ সংকুল। যারাই তক্তায় নামে কাজটি করার জন্য, তাদের প্রত্যেককে লাইফ জ্যাকেট পরে ও life line বেঁধে নামতে হয়। জাহাজের ডেকে সব সময়ে কেউ না কেউ থাকে যারা কাজ হল বাইরে থাকা লোকগুলোর ওপরে নজর রাখে।একই দ্রুততার সঙ্গে ইঞ্জিন ঘরের routine maintenance-এর কাজও চলছিল।

দুটো কাজই এগোচ্ছিল বেশ ভাল ভাবে। দ্বিতীয় দিন বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ চিফ অফিসার সরেজমিনে কাজের ধরণ এবং কতটা কাজ হয়েছে দেখবে ঠিক করল। জাহাজের পেছনের দিকে ঝোলান দড়ির সিঁড়ি থাকে, জাহাজি ভাষায় সেটাকে বলা হয় জেকব্স্ ল্যাডার। এটি আর দশটা সিঁড়ির মতন নয়, এ দিয়ে ওঠা নামার অভ্যাস না থাকলে খুবই কঠিন এটা ব্যবহার করা। নিয়ম হল মাথায় হার্ড হ্যাট পরে লাইফ জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে কোমরের বেল্টের সাথে লাইফ লাইন বেঁধে সিঁড়ি দিয়ে নামতে হবে। চিফ অফিসার এই তিনটি নিয়মের কোনওটাই না মেনে সিঁড়ি বেয়ে ঝোলানো তক্তায় নেমেছে। ডেকে থাকা ডেক-ক্যাডেট দাঁড়িয়ে নজর রাখছিল চিফ অফিসার ও অন্য যে সব খালাসীরা তক্তায় দাঁড়িয়ে রঙের কাজ করছিল, তাদের ওপর। হাতের কাছে রেখেছিল লাইফ বয়া (life buoy)। কাজ-পরিদর্শন করে চিফ অফিসার দড়ির সিঁড়ি বেয়ে যখন জাহাজের ডেকে উঠে আসছে তখন কোনও অজানা কারণে তাঁর হাত গেল ফসকে ... সোজা গিয়ে পড়ল নদীর জলে।

কঙ্গো নদীর জলও আমাদের গঙ্গা নদীর জলের মতন ঘোলা এবং ভাসমান আবর্জনায় ভর্তি। চিফ অফিসার জলে পড়ে প্রথমে সোজা তলিয়ে গেল। ডেকে দাঁড়ান ক্যাডেট পাশে রাখা life ringটি ছুঁড়ে দিল জলে, যদি ভেসে উঠে চিফ অফিসার সেটা ধরে ভাসতে পারে। এরই মধ্যে সে জাহাজের বিপদ সঙ্কেত বাজিয়ে দেওয়া হল। PA system-এ ঘনঘন ঘোষণা হতে থাকল Man-overboard। বিপদ সঙ্কেত শুনে ইঞ্জিন ঘর থেকে দৌড়ে আমিও ডেকে চলে এলাম। এরই মধ্যে কানে এসেছে খবরটি, চিফ অফিসার জলে পড়ে গেছে। ইত্যবসরে যারা জাহাজের বাইরের দিকে কাজ করছিল, তারাও ডেকে উঠে এসেছে। ক্যাপ্টেনও হাজির ডেকে। চিফ অফিসার জলে পড়ে গেছে শুনে তার মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা সবাই চেষ্টা করছি জলে পড়া চিফ অফিসারকে খুঁজে বের করতে। যাঁদের অভিজ্ঞতা নেই তারা বুঝবেন না জলের মধ্যে পড়া মানুষকে খুঁজে বের করা কি ভয়ানক দুরূহ কাজ। ক্যাপ্টেন ও আমি দৌড়ে ব্রিজে উঠে দূরবীনের সাহায্যে ওঁর কালো-চুল ভর্তি মাথাটি দেখতে পাই বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায়। সে তখন প্রায় এক কিলোমিটার+ দূরে ভেসে গেছে জাহাজ থেকে।

কঙ্গো নদীর স্রোত তিন থেকে চার নট (1.60 Kms=1.0 knot)। নদীটি গিয়ে পড়েছে দক্ষিণ অতলান্তিক মহাসাগরে। নদীতে প্রচুর কামট-কুমিরের বাস। দু পাড়ের মধ্যে ঘনঘন ফেরি চলাচল করে। অন্যান্য সমুদ্রগামী জাহাজ ও আসা যাওয়া করে এই নদী পথে। জলের মধ্যে কাল একটি ভাসমান মাথা দেখতে পাওয়া প্রায় অসম্ভব, যদি না কেউ ভেসে যাওয়া মানুষের খোঁজে না থাকে। কপাল গুণে যদি বা জাহাজ বা ফেরি লঞ্চের প্রপেলারে কাটা পড়ার থেকে বেঁচে যায়, কিন্তু কুমিরের মুখ থেকে জলে পড়া মানুষটা বাঁচবে কী করে?

জাহাজের সব থেকে উঁচু জায়গা জাহাজি ভাষায় “বাঁদর দ্বীপ”থেকে দূরবীনের সাহায্যে চিফ অফিসারের ভাসমান মাথাটির দিকে নজর রাখা হচ্ছিল। অন্য দিকে উল্কা গতিতে ইঞ্জিন চালিত লাইফ বোট জলে নামানর ব্যবস্থা করা হল। উদ্ধারকারীদের সাথে জাহাজের ক্যাপ্টেন ডিঙিতে নামার জন্য দেখি তৈরি হচ্ছে। তৎক্ষণাৎ তাকে নিরস্ত করলাম “ক্যাপ্টেন ও Chief Engineer কোন সময়ে জাহাজ ছেড়ে নামে না, যতই না কেন Emergency দেখা দিক।”। দুজন নাবিক ও দুজন অফিসার লাইফ বোট নিয়ে ভেসে পড়ল চিফ অফিসারকে নদী থেকে উদ্ধার করার জন্য।

যেহেতু নদীর দু-তীরেই সরকারি ও বিদ্রোহী সেনাদের মধ্যে যুদ্ধ চলছিল, এটাও আমাদের মাথায় রাখতে হচ্ছিল ভুল করে উদ্ধারকারীদের ওপর না গুলি বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে যায় পাড়ে থাকা সৈনিকদের তরফ থেকে! সেই কারণে ক্যাপ্টেন VHF, Walki Talki-তে বন্দর অধিকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল। কিন্তু কা কস্য পরিবেদনা; কোন জায়গা থেকে কোন উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে তখন জাহাজের পাহারায় যে সেনাবাহিনীর জওয়ানরা ছিল তাদের ব্যাপারটি বলা হল ও অনুরোধ করা হল তাদের ঊর্ধ্বতন অফিসারকে জানাতে জাহাজের চিফ অফিসারের নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটি।

এদিকে স্রোতের টানে ভেসে চলেছে চিফ অফিসার, তাকে উদ্ধারের তাগিদে তাড়া করে যাচ্ছে জাহাজের লাইফ বোট। এরই মাঝে দেখা গেল একটি পণ্যবাহী জাহাজ নদীর মোহনা থেকে বন্দরে ঢুকছে। আর দুটি জাহাজ তাদের পণ্য নামিয়ে বন্দর ছেড়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে মহা সমুদ্রের উদ্দেশ্যে। আমরা যারা জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে চোখ রাখছিলাম উদ্ধারকারী নৌকার দিকে, সবাই দম বন্ধ করে নেপচুন সাহেবের দরবারে প্রার্থনা করছিলাম, কোন কারণে যেন চলমান জাহাজগুলি চিফ অফিসারের আশেপাশে না এসে পড়ে। কারণ; জাহাজের ঘূর্ণায়মান প্রপেলার তার আশপাশ থেকে জল টেনে নেয় ও পাখার মধ্যে দিয়ে তাকে পিছনের দিকে ঠেলে দেয়, সেই ভাবে জাহাজ এগিয়ে চলে। একবার যদি ভেসে যাওয়া চিফ অফিসার সেই টানে পড়ে তবে তার খণ্ড-বিখণ্ডিত দেহাবশেষ উদ্ধার করে আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে। ভালোয় ভা্লোয় তিনটি জাহাজই চিফ অফিসারের পাশ থেকে বেরিয়ে গেল। আমাদের উদ্ধারকারী বোট যখন নাগাল পেল ভেসে যাওয়া মানুষটির ততক্ষণে প্রায় তিন ঘণ্টা+ পেরিয়ে গেছে। বোটকে খুব সাবধানে তার থেকে বেশ কিছুটা দূর দিয়ে তাকে পেরিয়ে, গতিপথ ঘুরিয়ে তাকে বোটের দিকে ভেসে আসতে দিল। সমস্ত maneuver(প্রণালীটি) Walkie Talkie মারফত জাহাজ থেকে নির্দেশ দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছিল। চিফ অফিসার যখন boat hook-এর নাগালের মধ্যে চলে এল তখন তার পরনের cover-all এ আঁকশি আটকে টেনে আনা হল নৌকার ধারে। ইঞ্জিন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল যাতে কোন ভাবেই মানুষটি প্রপেলার-এ জড়িয়ে না যায়। কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ থাকার জন্য কোন রকম দিশাই রাখতে পারছিলনা বোটর চালক অফিসার। নৌকার পাশে টেনে এনে ছয় ফুট লম্বা ১১২ কেজি ওজনের মানুষটিকে জল থেকে নৌকায় তোলার সময়ে নৌকাটির প্রায় উল্টে যাবার যোগাড়। কোন রকমে তাকে টেনে নৌকায় তুলে ইঞ্জিন চালু করে যখন জাহাজের দিকে ফিরে আসছিল উদ্ধারকারীরা, তখন কোথা থেকে মূর্তিমান যমদূতের মতন কঙ্গোলিস্ সরকারের একটি Gun boat এসে তাদের পথ আটকাল। ক্যাপ্টেন তাদের walki-talki মারফৎ অনেক বোঝাবার চেষ্টা করল কী কারণে লাইফ বোট জলে নামান হয়েছিল। কে বোঝে কার কথা। Gun boat-টি উদ্ধারকারী নৌকা ও সাথে চার উদ্ধারকারী ও ভিজা বেড়াল চিফ অফিসারকে নিয়ে তাদের জেটিতে গিয়ে ভিড়ল। কপাল ভাল আমাদের, এরই মধ্যে জাহাজের স্থানীয় এজেন্ট এসে উপস্থিত। তাকে পুরো ব্যাপারটি বুঝিয়ে বলার পর ক্যাপ্টেন ও আমি উর্দি গায়ে চড়িয়ে এজেন্ট এর সাথে চললাম আমাদের মানুষগুলো ও নৌকাটিকে উদ্ধার করে আনতে কঙ্গোলিস্ নৌসেনাদের খপ্পর থেকে। নৌসেনার অফিসে পৌঁছে বহু বোঝানোর পর নেভাল অফিসার বেজার মুখ করে মানুষগুলোকে রেহাই দিতে সম্মত হল। কিন্তু লাইফ বোটটিকে জলে ভাসিয়ে জাহাজের পাশে ভিড়তে দিতে কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না। জাহাজের এজেন্ট নৌ-অফিসারের সাথে নিজেদের ভাষায় আলোচনা সাঙ্গ হবার পর জানল এক বাক্স স্কচ হুইস্কি(১২-বোতল) দিলে তবেই সে ছাড়তে পারে নৌকাটিকে। অনেকক্ষণ দরাদরি করে ঠিক হল ছটা বোতল তাকে দিতেই হবে। কী আর করা, রাজি হতে হল আমাদের, কারণ জাহাজ কখনই একটি লাইফ বোট নিয়ে মহা সমুদ্রে পাড়ি জমাতে পারেনা। Insurance company-র আইনে সেটা দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা নৌ-অফিসার কে সাথে নিয়ে ফিরে এলাম জাহাজে। অন্য দিকে নৌকা নিয়ে অফিসার ও নাবিকরা জাহাজের পাশে এসে দাঁড়ায়, Life boat winch-এর সাহায্যে তাকে তুলে নেওয়া হয় জাহাজে। সমস্ত কাণ্ডটির জন্য মোটে সাড়ে সাত ঘণ্টা লেগেছিল।

নৌ-অফিসার তার চাওয়া বোতল নিয়ে জাহাজ থেকে খুশি মনে নেমে যাওয়ার পর, ক্যাপ্টেন ও আমি দুজনে মিলে এক হাত নিলাম চিফ অফিসারকে। তারপরেই ঠিক হল সেদিন সন্ধ্যার সময়ে ওকে ডেকে পার্টি দিতে হবে। সেও লজ্জা-লজ্জা মুখ করে মেনে নিলো ব্যাপারটি।

আবার একটি জিনিষ প্রমাণিত হল; জাহাজিরা এক অদ্ভুত জীব, তাদের তুলনা তাদের সাথেই করা যায়। যে কোন সাধারণ মানুষ যদি এই ভাবে জলে পড়ে যেত আমি নিশ্চিত ভয়ে তার হৃদযন্ত্র আপনা থেকে বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু চিফ অফিসার জলে পড়ার পর প্রায় চার সাড়ে চার ঘণ্টা+ life buoy ধরে ভেসেছিল, কিন্তু জাহাজে ফিরে সে ব্যাপারে তার কোন চিত্তবৈকল্য দেখলাম না। সবাই ব্যাপারটি নিয়ে হাসাহাসি করছিল। চিফ অফিসারের প্রথম উক্তি, “জল বড্ড নোংরা”। মনে হবে সে বোধ হয় কোন ময়লা swimming pool-এ সাঁতার কেটে এলো বাইরে থেকে।

বাপ রে; কি ধাতু দিয়ে তৈরি এই নাবিকেরা??


লেখক পরিচিত - মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর স্নাতক। চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বহু বছর নানান সাগর ঘুরে এখন অবসর নিয়েছেন। বেড়াতে ভালোবাসেন, ছবি তুলতেও।  

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.