অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


বিবিধ প্রসঙ্গ

জুন ১৫, ২০১৭

 

আহারে অহোম

সৌরাংশু

“অহোমই আই রুপহি গুণরো নাই হেশ
ভারতরও পূর্ব দিহর হুর্হ উঠার দেশ।।”

“মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র, মহামিলনোতীর্থও
কথ যুগ ধরি আহিসে পরকহি
সমন্বয়র অর্থও...”

ভারতের উত্তর পূর্বের প্রবেশ দ্বার ব্রহ্মপুত্র ও বরাক উপত্যকা এবং কার্বি আংলং ও ডিমা হাসাও জেলা নিয়ে প্রযুক্তি বিদ্যার ‘টি’ বা লাগার্দের ‘এল’এর মতো আসাম বা অহোম রাজ্য। প্রাকৃতিক উপাদান, সংস্কৃতি শিল্পকলা নিয়ে পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশে স্বয়ম্ভু এক রাজ্য। তবে কি না আসাম রাজ্যের সংস্কৃতি ও শিল্পকলায় মূল স্রোতের থেকে ভিন্ন হলেও পূর্ব বঙ্গের বিশেষত শিলেটের নৈকট্যের কারণে বঙ্গ সংস্কৃতি এবং খাওয়া দাওয়া একটা সমান্তরাল কিন্তু শক্তিশালী ধারার তৈরী করেছে।

আর বিরোধটা এখানে সৃষ্টি করেছে এক মিশ্র সংস্কৃতি এমনকি খাদ্য সংস্কৃতিরও।

কালিকা পুরাণ অনুযায়ী, দানব সাম্রাজ্যের হাতেই প্রাগজ্যোতিষপুর বা প্রাচ্যের জ্যোতিষচর্চার কেন্দ্রের গল্প শুরু। মহীরঙ্গ দানব ছিল এর স্রষ্টা। দ্বাপরে এসে নরকাসুর এখানকার রাজা হয়ে বসেন এবং শেষে কৃষ্ণের হাতে মৃত্যু হয়। নরকাসুরের ছেলে ভগদত্ত পাণ্ডবদের পক্ষ নিয়ে কুরুক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

আসাম বললেই ব্রহ্মপুত্রের কথাও আসে। তিব্বতের তালুং সো হ্রদ থেকে সৃষ্ট ব্রহ্মপুত্র নদ, হিমালয় পেরিয়ে অরুণাচল ছুঁয়ে আসামের বুকের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে বাংলাদেশে পদ্মার সঙ্গে মিশেছে। কথিত আছে, রাজা শান্তনুর স্ত্রী অমোঘা ব্রহ্মার ঔরসে এক সন্তানের জন্ম দেন। যাঁকে শান্তনু কৈলাশ, গন্ধমাদন, জরুধি ও সম্বর্তকা পর্বত পরিবেষ্টিত স্থানে রেখে আসেন, ব্রহ্মার পুত্র জলের রূপ নেয় ব্রহ্মকুণ্ড নামে। পরশুরাম পিতৃআজ্ঞা পালন করে মাতৃহত্যা করেন তখন শাস্তি স্বরূপ কুঠার হাতে আটকে যায়। ঋষিমুনিদের পরামর্শে পরশুরাম তীর্থ করতে বেরোন। ব্রহ্মকুণ্ডে পৌঁছে তাঁর কুঠার ছুঁড়ে পাহাড়ের একদিক কেটে ব্রহ্মকুণ্ড থেকে ব্রহ্মপুত্রের যাত্রা শুরু হয়। কুঠারের রক্ত পবিত্রে জলে ধুয়ে যায় কিন্তু জলের রঙ লাল হয়ে যায়। ফলে অসমীয়া ভাষায় ব্রহ্মপুত্রের নামকরণ হয় ‘লুই’ বা ‘বুড়হা লুই’।

তা এই ব্রহ্মপুত্রই কিন্তু আসামকে সুজলা সুফলা করে তুলেছে। বৃহত্তম বদ্বীপ মাজুলিও ব্রহ্মপুত্রেই। নদীমাতৃক (নদ হলে কি পিতৃক হবে? কে জানে!) বলেই আসামের নিজস্ব স্বাদ কোরকে মাছের আনাগোনা। রুই কাতলা মৃগেল প্রভৃতি মিষ্টি জলের মাছ আসামের খাদ্য সংস্কৃতিতে ঠাঁই নিয়েছে। কিন্তু আসামের রান্না মানে কি শুধু অহমীয়া রান্না? অহমীয়া বা তাই-অহোমরা চীনের ইউনান রাজ্য থেকে এসেছেই মাত্র দ্বাদশ শতাব্দীতে। কিন্তু তার আগে থেকেই প্রায় ১৭টি ভিন্ন ভিন্ন উপজাতি যেমন বোড়ো, কার্বি, মিশমি, রাভা প্রভৃতি এই অঞ্চলে আস্তানা গেড়েছিল।

অবশ্য তথাকথিত বাঙালিরা বা বঙ্গবাসীরা ব্রহ্মপুত্র ও কাছাড়ে বহুদিন ধরেই ছিল। কিন্তু আসল আনাগোনা শুরু হয় ১৮৪০-এ ইঙ্গ-বার্মীজ যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ধীরে ধীরে আসামের সমগ্র অঞ্চলকে কব্জায় নিয়ে আসার পর। কব্জায় তো নিয়ে এলাম কিন্তু রাজস্ব সংগ্রহের ফাইল টাইল কে চালাবে? কেন সবার আগে যারা নতিস্বীকার করে আছে, সেই বাঙালি বাবু! তো বঙ্গদেশ থেকে বঙ্গভাষীদের আগমন। আর ধীরে ধীরে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, উত্তর আসাম এবং দক্ষিণ আসামের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো নিজেদের কব্জায় নিয়ে এল তারা। সঙ্গে করে এল তাদের খাবার দাবারও। তাই দেখা যায় অহমীয়া ডিশে খার, টেঙ্গা, পুড়া ইত্যাদি ছাড়া অধিকাংশই বঙ্গ রন্ধ্রনপ্রণালী, বিশেষতঃ বাঙাল রান্নার অপভ্রংশ।

তা এই খারটা কি? কথ্য বাংলা স্ল্যাং-এ না হয় খার মানে রাগ বোঝায়। কিন্তু অহমিয়ায়? যাই হোক খার রান্না করার জন্য বিশেষ ধরণের কলার খোসা রোদে শুকনো হয় তারপর তাকে পুড়িয়ে তাকে ছাঁকনিতে রেখে জল ঢেলে নিলে ছাঁকনির নিচে যে ছাইভেজা জল জমা হয় সেটাই তাকেই বলা হয় ‘কলা খার’ (কলাকার নয়!)। এবার থোড় বা পেঁপে বা কুমড়ো বা অন্য যে কোন শাঁসওলা সব্জি ডুমো ডুমো করে কেটে, হলুদ জলে ভিজিয়ে রাখুন এক ঘন্টা। এর পর কড়াইয়ে তেল গরম করে আদা রসুন বাটা দিয়ে কষে নিয়ে সিদ্ধ কাঁঠাল বিচি দিয়ে নাড়তে নাড়তে সব্জি দিয়ে হলুদ নুন দিয়ে নেড়ে নিন মিনিট তিনেক। তারপর খার দিয়ে ভাল করে সিদ্ধ করুন। প্রয়োজনে শুরুতে ফোড়ন হিসাবে বিউলির বা ছোলার ডালও ব্যবহার করতে পারেন। তরল খার যাকে ‘খারোলি’ বলে সেটিকেও নুন সর্ষের তেল দিয়ে ভাত দিয়ে মেখে খাওয়া যায়।

এ ছাড়াও অহমীয়ারা তিক্ত স্বাদ যথেষ্ট পরিমাণে গ্রহণ করে। নিমপাতা ভাজা, হুকুতা (শুক্তো), কচি বাঁশের তরকারি, শিউলি ফুল ইত্যাদি তাদের ডায়েটে বিশিষ্ট ভাবে আসন গ্রহণ করে থাকে।   

তবে অসমীয়ারা গ্রহণ করে থাকে বললেই হবে? আগেই তো বললাম, অসম চার এলাকায় বিভক্ত। উত্তর আসাম, দক্ষিণ আসাম বরাক আর ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা। সেই ব্রহ্মপুত্র বা বুড়া লুই। যার হৃদয়ে কিলবিল (kill bill নয়) করে বেড়াচ্ছে  মৎস্যরূপী জলচররা। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এই অঞ্চলের রান্নাবান্নায় মাছের উপস্থিতি নজরকাড়া। দুটো রেসিপি বলি না হয়।

একটা হল মাসর টেঙ্গা। টেঙ্গা তো টক, তাই এই মাছের টক ঝোল রান্না করতে হলে, রুই কাতলা মৃগেল প্রভৃতি মাছ নুন হলুদ মাখিয়ে রাখুন। আলু ঝিঙে ডুমো ডুমো করে কেটে রাখুন। মাছ ভালো করে ভেজে নিয়ে সরিয়ে রাখুন আর সেই তেলে মেথি কাঁচালংকা ফোড়ন দিয়ে আলু আর ঝিঙে দিয়ে নেড়ে নিন ঢাকা দিয়ে। সব্জি নরম হয়ে এলে টম্যাটো দিয়ে নরম হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তারপর পরিমাণ মতো জল দিন। ফুটতে শুরু করলে মাছভাজাগুলি দিয়ে দিন। মিনিট দশেক পর লেবুর রস আর ধনেপাতা কুঁচি দিয়ে নামিয়ে নিন।

পরেরটা হল নরসিং মাসর ঝোল। নাম শুনলেই বোঝা যাচ্ছে আদা পেঁয়াজ রসুন দিয়ে কষকষে বানানো হবে। তবে আসামিয়া স্টাইলে খুব গরগরে রান্না হয় না। আর নরসিং পাত মানে কারি পাতা। তাই এই রান্নার জন্য কারিপাতার একটা পেস্ট তৈরী করতে হবে। ঈষদুষ্ণ গরম জলে তা ভাল করে গুলে নিয়ে রেখে দিয়ে তেলে আদা পেঁয়াজ রসুন কষে তাতে নুন হলুদ লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে আলু কষে কারিপাতার ঝোল ঢেলে নেড়ে নিয়ে তাতে ভেজে রাখা মাছ দিয়ে ঢাকা দিয়ে রান্না করে নিতে হবে। এই আর কি।

ইদানীং কালে, বেশ কয়েকবার গৌহাটি গেলাম। প্রথমবার গিয়েই মাসর টেঙ্গা দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম হোটেল ব্রহ্মপুত্রে, তারা কিন্তু লেবুর জায়গায় লেবুপাতা ব্যবহার করেছিল আর পাতলা ঝোল। সিরিয়াসলি বলছি, পাতলা ঝোল দিয়ে গরম গরম মোটা বরো সউলের ভাত অমৃতর স্বাদ ছিল। মানে আমি হলাম এসেন্সিয়ালি রুটি পার্সন। বিরিয়ানি ছাড়া সারা সপ্তাহে আমার ভাত না হলেও চলে। তার মুখ থেকে যখন শুনছেন একবার টেরাই মেরে দেখবেন নাকি?

মাছ ছেড়ে মাংসের দিকে যাই। অহমীয়া সগোলি মাংসর ঝোল। মূলত উত্তর আসামের খাবার। খাসির মাংস অর্ধেক পেঁপের পাল্প বানিয়ে তাতে ম্যারিনেট করে রাখুন। বাকি অর্ধেক বড় বড় ডুমো ডুমো করে কেটে রাখুন, আলুও। সরষের তেলে পেঁয়াজ রসুন আদা দিয়ে কষে তাতে হলুদ গুঁড়ো, ধনে জিরে বাটা এবং ছোট এলাচ ও তেজপাতা দিয়ে নাড়তে থাকুন। এবারে পেঁপের পাল্পের অতিরিক্ত অংশ মাংসের থেকে তুলে নিয়ে চিপে রস মাংসের মধ্যে মিশিয়ে দিন। মাংসগুলো এবারে কষতে থাকুন। ভালভাবে কষা হয়ে গেলে বা তেল ছেড়ে দিলে তাতে আলু আর পেঁপে দিন। এরপর জল দিয়ে সিদ্ধ করে নামাবার আগে এতে লেবুর রস আর গোল মরিচ গুঁড়ো দিন।  

কিন্তু এধরণের রান্না তো আমরা হরহামেশাই করেছি। পেঁপে বাটা দিয়ে মাংস কি নতুন কিছু হল। আসলে অহমীয়া রান্না বলতে গেলে আমরা অনেকেই বাঙালি রান্নার অফসুটকে বুঝি, সে রকম লিখেওছি। কিন্তু আসল আসাম বা অসম বা awesome তো সমতলে নয়। তারা বাস করে পাহাড়ে এদিক ওদিকে উপজাতি গ্রামগুলোতে। সেই বোড়ো, কার্বি, মিশমি, রাভা এদের খাবার দাবার একটু চেখে দেখব না?

বোড়ো উপজাতিরা হল কাচরি বা কাসৌরি জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত। বোরোদের রান্নাঘর মন্দিরের সমান। গৃহকর্ত্রী এবং কয়েকজন সহায়ক ছাড়া সেখানে অন্য কারুর প্রবেশ নিষেধ। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জমানো বা সংরক্ষিত খাদ্য খাওয়ার চল দেখা যায়। কিন্তু বোড়োরা এই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে স্মোকের মাধ্যমে সংরক্ষণের পদ্ধতিকে। মাছ কিংবা পর্কের টুকরোকে ধোঁয়ায় শুকিয়ে নিয়ে বাঁশের আধারে জমিয়ে রাখা হয়।

মূলত আমিষ দিয়েই বোড়োদের রান্না হলেও সবজিগুলি অধিকাংশক্ষেত্রে চিকেন (বোড়ো ভাষায় ‘দাউ’) আর পর্ক (বোড়ো ভাষায় ‘ওমা’)-এর শয্যাসঙ্গীর কাজ করে। একটা রেসিপি বলি ‘দাউজং কুমরাজং’ কুমড়ো দিয়ে দেশি চিকেন। আদা রসুন পেঁয়াজ গরম মশলা তেজপাতা নুন হলুদ লঙ্কা পেস্ট করে চিকেনে মাখিয়ে তেলে ভাজুন। ভাজাভাজা হয়ে এলে কুমড়ো দিন। ভালো করে নেড়ে নিয়ে জলছড়া দিয়ে দিয়ে সিদ্ধ করুন। এবারে এমন ভাবে নাড়ুন যাতে কুমড়ো থকথকে গ্রেভির কাজ করে। নামাবার সময় ধনেপাতা কুচি দিয়ে নামিয়ে নিন।

আরেকটা হল ‘নাথুরজং আলুজং’। চিংড়ি মাছ ধুয়ে রোদে একঘণ্টা শুকিয়ে নিন। তারপর একটা বাঁশের স্টিমারে (এই স্টিমারে করে ভেসে যাওয়া যায় না। সিদ্ধ হয় খালি। মোমোর আধার আর কি!) চিংড়িগুলিকে রেখে কাঠকয়লার আঁচে ধোঁয়া দিন। এরপর ঠাণ্ডা করে নিয়ে এই স্মোকড চিংড়িগুলি হালকা নুন আর হলুদ দিয়ে ভেজেই তুলে নিন। লঙ্কা দিন তেলে, আদা রসুন পেঁয়াজ পেস্ট দিন, নুন হলুদ দিয়ে টমেটোর টুকরো দিন। প্রায় সিদ্ধ হয়ে গেলে, ডুমো ডুমো করে কাটা আলু দিন। নেড়ে নিয়ে পরিমাণমতো জল দিয়ে ঢাকা দিয়ে সিদ্ধ করুন। আলু প্রায় সিদ্ধ হয়ে এলে চিংড়ি দিয়ে আঁচ কমিয়ে ঢাকা দিয়ে বসিয়ে দিন। নামাবার আগে ধনেপাতা কুচি দিয়ে দিন।

‘খাঁখড়াই বাথন’ বা কাঁকড়ার চাটনি। কাঁকড়ার শাঁস বার করে আদা রসুন পেঁয়াজ দিয়ে কষে নিন। নাগা মরিচ বা কাঁচা লঙ্কা আর ভাজা পেঁয়াজ হামা দিস্তা দিয়ে পিসতে থাকুন শেষে ভাজা কাঁকড়া দিয়ে ভালো করে পিষে মিশিয়ে নিন। বাথন প্রস্তুত।

আর শুরুর দিকে স্মোকড ‘ওমা’র কথা বললাম, তা দিয়ে ‘ওমাগরানজং আলুজং’ বানান। স্মোকড পর্কের টুকরোগুলোকে ভেজে নিয়ে আদা পেঁয়াজ রসুন গরম মশলা তেজপাতা আর লঙ্কা দিয়ে আর আলু দিয়ে রান্না।

এবারে কার্বি রান্না। দক্ষিণ আসামের কার্বি উপজাতিরা তেল বা মশলা ছাড়াই রান্না করে চলেছে, যা সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকরও বটে। মূলত ছয় প্রকারের রান্না পদ্ধতি।

কালাংডাং- মাছ বা মাংসকে তেল বা মশলা ছাড়া রান্না করার পদ্ধতি হল কালাংডাং। আদা, রসুন, তিল গুঁড়ো, নুন আর হলুদ আর পরিমিত জল দিয়ে রান্না। বাঁশ দিয়ে মাংসের ক্ষেত্রে হালকা টক কচি বাঁশের টুকরোকে উপরোক্ত উপকরণের সঙ্গে পরিমিত জলে সিদ্ধ করে রান্না। এতে কুমড়ো আলু ইত্যাদি সবজিও দেওয়া যায়।

কাংমই- কাংমইতে খার ব্যবহৃত হয়। সেই খার যা হল অ্যালকালি যা কলার খোসা পুড়িয়ে বা সামান্য খাবার সোডা ব্যবহার করে তৈরী হয়। বিভিন্ন সবজি যেমন পেঁপে, কচু, মানকচু, কুমড়ো, বেগুন ইত্যাদি কাংমই পদ্ধতিতে রান্না হয়। শুঁটকি মাছও এর মধ্যে দিয়ে দেওয়া হয়।

কিমাং- মাছ মাংস আদা রসুন হলুদ নুন লঙ্কা মাখিয়ে কলাপাতায় বা ‘লোরু’ পাতায় মুড়ে কচি বাঁশের মধ্যে মুড়ে পুড়িয়ে নেওয়া হয়। তারপর বাঁশ ফাটিয়ে খাওয়া হয়। অবশ্য কিমাং পদ্ধতিতে চালও সামান্য জল দিয়ে কলাপাতায় মুড়ে বাঁশে পুড়ে রান্না করা যায়। ডাল এবং চাও নাকি এই পদ্ধতিতে রাঁধা যায়। তবে মাছ বা ভাত খাওয়া হলেও চা আমি কখনই খাই নি, তাই ঠিক বলতে পারব না সে কিরকম হবে। তবে মাছ ভাত যেমন হচ্ছে এটাও মন্দ হবে না বলেই মনে হয়।

কাংথু- মাছ মাংস সবজি হাবিজাবি লপং পাতা দিয়ে মাখিয়ে কলাপাতায় মুড়ে সরাসরি কাঠকয়লার আগুনে পোড়ানো হয়। কার্বিরা এক ধরণের ছোট মাশরুম মুসিও খায় এই পদ্ধতিতে রান্না করে।

কিফি- গরম কাঠকয়লায় মাছ বা মাংস সেঁকে খাওয়া হয়।

আর হল কার্নু পেক্রাংসই- তেল বা জল ব্যবহার না করে হার্বস বা থেঁতো করা রসুনকে গরম পাত্রে নেড়ে নিয়ে খাবার সময় ব্যবহার করা হল কার্নু পেক্রাংসই।

টক টক হিঞ্চে শাক দিয়ে মাছ বা মাংসের হেঞ্চেরন বেশ পছন্দসই খাবার বটে। আচ্ছা এই যে হার্বস দিয়ে রান্না এই হার্বসগুলো কি কি বলুন তো? কার্বিরা আগে কি করত, বনে জঙ্গল থেকে ডুংকেক, তারা, হান্তু, মেহেক ফি-কাংনেক, হান সাংবি, হান রিশাক, হান থাই, হান রিপো ইত্যাদি নানান ধরণের হার্বস সংগ্রহ করে শুকিয়ে নেয়। আর রান্নায় ব্যবহার করে। এখন অবশ্য কিচেন গার্ডেন করছে তারা। দক্ষিণ আসামের পথের ধারের রেস্তোরাগুলোরও এই কিচেন গার্ডেন ব্যবহার করতে দেখেছি।

সে যাই হোক, আবার ফিরে আসি চট করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়। বুড়া লুইয়ের ধারের তিন উৎসব। যার কথা ফিসফাস কিচেন একে উল্লিখিত। রঙ্গালি বিহু নতুন বছরে, কাঙ্গালি বিহু কর্কট সংক্রান্তিতে আর ভোগালি বিহু মকর সংক্রান্তিতে। আর আমাদের নজর থাকছে ভোগালি বিহুতেই। তা ভোগালি বিহু নিয়ে তো সংক্রান্তি পর্বেই লেখা হয়েছে। আমি খালি টুক করে দুটো রেসিপি ছেড়ে যাই, যা সেবারেও ছিল।

সুঙ্গা পিঠা। বোরা চাল আর হালি চালের আটা ভাল করে জল আর গুড় দিয়ে মেখে কচি বাঁশের খোলে ভরে কলা পাতা দিয়ে মুখ বন্ধ করে আগুনে পোড়ানো হয়। হয়ে গেলে বাঁশ ফাটিয়ে বার করা হয় সুঙ্গা পিঠা। যা কিনা উত্তর পূর্বের বাঙালিদের মধ্যে চোঙা পিঠে নামে পরিচিত। বোরা চাল হল বিন্নিধানের চাল।

তিল পিঠা। বোরা চাল সারা রাত ভিজিয়ে রেখে পরের দিন গুঁড়ো করে নিন। তিল শুকনো খোলায় ভেজে নিয়ে গুঁড়ো করে নিন।  চালগুঁড়িকে ভাল করে মেখে মণ্ড তৈরী করে ছোট ছোট লুচির মতো বেলে নিন। তাওয়ায় গরম করতে থাকুন। প্রায় শক্ত হয়ে এলে তিল গুঁড়ো গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে ঐ লুচিগুলির মধ্যে লম্বালম্বি রেখে রোল করুন এবং উল্টে পাল্টে সিদ্ধ করে নিন।

আর এ ছাড়াও আছে কমলালেবুর খোসা দেওয়া টেকেলি পিঠা আর ভাজা পিঠা ‘ঘিলা পিঠা’।

সাত ভাই চম্পার দেশ উত্তর পূর্ব ভারতের প্রবেশ দ্বার আসাম। জনশ্রুতি অনুযায়ী নামকরণ এসেছে সংস্কৃত ‘অসম’ শব্দ থেকে যার অর্থ অতুলনীয়। ভারতবর্ষের মূল স্রোতের বাইরে থেকেও নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে প্রকৃতির কোলে এক অপূর্ব অঞ্চল। যদিও জানি যে বঙ্গভাষীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, উদ্বাস্তু সমস্যা এবং উগ্রপন্থায় ঘিরে রয়েছে আসামের পরিমণ্ডল তবুও প্রকৃতির বুকে প্রকৃতিকে সঙ্গে করেই এক অনন্য খাদ্য সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে সেখানে। আসাম দিয়ে প্রবেশ করে আমরা ধীরে ধীরে চেখে নেব উত্তর পূর্বের অচেনা সৌন্দর্যকে। তবে তা পরের পর্বে। এখন তাহলে এ পর্যন্তই!

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ কথা হতে পারে যে আসামের রান্নাবান্না হল, কিন্তু বরাকের হল না কেন? বরাক উপত্যকা। বরাক বা সুরমা নদীর দুপাশের যে অংশটুকু হিন্দু প্রধান হবার দায়ে সিলেট থেকে ছিঁড়ে ভারতের কোলে পড়ল, আর জন্মলগ্ন থেকেই অহোম ভাষা ও বাংলা ভাষার দড়ি টানাটানির শিকার হল। সেই বরাক উপত্যকার রান্নাবান্না হিলটি বা সিলেটী রান্নার থেকে আলাদা কিছু নয় আর তা ইতিমধ্যেই আমরা ঘুরে এসেছি বলেই আর ছুঁলাম না। ছুঁলাম না বটে কিন্তু হৃদয়ে কোথায় যেন এই ঈশান বাংলা একটা রিনরিনে ব্যথা রেখে যায়। সঙ্গে নিয়ে চলতে না পারার ব্যথা, পাশে দাঁড়াতে না পারার ব্যথা। তবে সে অন্য কোনখানে অন্য প্রসঙ্গ। আজ থাক।


লেখক পরিচিতি: লেখক ভারত সরকারের আধিকারিক। অধুনা দিল্লিবাসী এবং নিয়মিত বাংলা ব্লগার। খাদ্য সংস্কৃতি নিয়ে ফিসফাস কিচেন-১ ইতিমধ্যেই সৃষ্টিসুখ থেকে গত বইমেলায় প্রকাশিত। এটি দ্বিতীয় মরশুম। এছাড়াও লেখকের আরও তিনটি গদ্য-গল্পের বই রয়েছে।                  

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.