অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


সাহিত্য

মে ১৫, ২০১৭

 

জসীমউদ্দিন : কবির কথা কবিতার কথা

আইভি চট্টোপাধ্যায়

“এই গাঁয়েতে একটি মেয়ে চুলগুলি তার কালো কালো,
মাঝে সোনার মুখটি হাসে আঁধারেতে চাঁদের আলো।”

কবিতার নাম ‘রাখালী’।

“আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমন্দীর ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা-ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।”

কবিতার নাম ‘আসমানী’।

নিসর্গের বর্ণনা নেই, বিদ্রোহের দামামা নেই, সংগ্রামী স্ফুলিঙ্গ নেই, নবজাগরণের আহ্বান নেই। শুধু আছে বাংলার একান্ত আপনজনের ভাষায় পল্লীগ্রামের সাধারণ মানুষের আবহমান সুখদুঃখ হাসিকান্না বেদনার সাতকাহন। কবির নাম জসীমউদ্দিন। পল্লীকবি জসীমউদ্দিন।

কবিতায় তিনি পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন রসুলপুরের আসমানী আর নকশী কাঁথার মাঠের হাসু রূপাইয়ের সঙ্গে। মামাবাড়ির আনন্দের স্বাদ এনে দিয়েছেন কবিতায়, আনমনে খেলা করে যাওয়া রাখাল বালকের কথোপকথন শুনিয়েছেন, নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন তাঁর বাড়িতে যাবার জন্যে। অত্যন্ত সহজ আন্তরিক ভাষায়।

‘তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি
মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভাইয়ের স্নেহের ছায়,
তুমি যাবে ভাই – যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়…”

কবিতার নাম “নিমন্ত্রণ”।

কিংবা বিখ্যাত কবিতা ‘কবর’।

“ওই খানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখে‍ছি দুই নয়নের জলে
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু পরীর মত মূখ
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেছে বলে ‍কাদিঁয়া ভাসাইত বুক
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিয়া ভেবে হইতাম সাড়া
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া গেল কারা... ”

কবর কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে এক অবিস্মরণীয় অবদান।

এই কবর যেখানে, সেই ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে কবির জন্ম। তাঁর নানার বাড়িতে। নানা, অর্থাত্‍ মাযের বাবা। ১ জানুয়ারি ১৯০৩ সালে জন্ম। পুরো নাম জসীম উদ্দীন মোল্লা। তাঁর পৈতৃক ভিটে তাম্বুলখানার পাশের গ্রাম গোবিন্দপুরে। কুমার নদীর তীরে এই গোবিন্দপুর গ্রামেই  কবির বাল্যকাল ও কৈশোর অতিবাহিত।

এই গোবিন্দপুর গ্রামেই কবির নিজের কবর, শিয়রে একটি ডালিম গাছ। কবির পাশেই আরও এগারোটি কবর। কবির পরিবারের মানুষজন পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছেন। কবরের বেদি ছাড়িয়ে  দক্ষিণমুখো কবির বাড়ি। পাকা বাড়ি একটি, সেখানে লেখা আছে কবি ভবন। কিন্তু কবি যে ঘরে থাকতেন সে বাড়ির ভিতরে উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি চৌচালা টিনের ঘর। এই ঘরের সামনে সিঁড়ি, সিঁড়ির দু’দিকে লেবু গাছ, মাঝখানে ডালিম। একটু দূরে পেয়ারা গাছ। এই জায়গাটিই তাঁর সৃষ্টির উৎসভূমি। এই ভূমিবাসের ফলেই তাঁর লেখনীতে বারবার উঠে এসেছে পল্লীমানুষের জীবন ও চালচিত্র,  শ্রমিক দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষের কথা,  বাতাসে আপনমনে দোলা কুমড়োর ডগা, কচি পাতা,  ছোট্টো নদীর ধারের মাঠের রাখাল, সাপুড়ের মেয়ের কথা। অপূর্ব অনুপম কাব্যগাথা।

অবশ্য যে কোনো পল্লীকবির কবিতা রচনার একটা প্রধান ধারা এই নিয়েই। কিন্তু কবি জসীম উদ্দিনের কবিতা কি এমনি এমনি সমসাময়িক ?  কবির নকশি কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট,  এক পয়সার বাঁশি সংস্করণের পর সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। অতএব এই পল্লীকবির কবিতা নির্মাণ কলায় এমন কিছু আছে যা বাঙালি জীবনের কিংবা বাঙালি যাপনের সমকালীনতাকে ধারণ করে আছে।

১৯২৭ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’ প্রকাশিত হয়। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় আলোড়িত কাহিনী কাব্য ‘নকশীকাঁথার মাঠ।’ ১৯৩৩ সালে প্রবাদ প্রতিম পুরুষ এবং ময়মনসিংহ গীতিকার সম্পাদক ডঃ দীনেশচন্দ্র সেনের অধীনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট বা সহকারী গবেষক পদে যোগ দেন। ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। কলকাতায় তাঁর কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠ লাভের ক্ষেত্রে দীনেশচন্দ্র সেনেরই অবদান বেশী। তিনিই কবির প্রথম কাব্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ প্রকাশ করার এবং কবির ‘কবর’ কবিতাটি ম্যাট্রিক ক্লাশে পাঠ্য করার ব্যবস্থা করেন দেন। ডঃ দীনেশচন্দ্র সেনের নির্দেশে ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসাহিত্য সংগ্রহ করতে গিয়ে কবি ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রতিটি পল্লীগ্রামে অবস্থান করেন। বাংলা শাশ্বত শব্দ ও রীতি তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল এই লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণার কাজ করার সময়। এই সময় থেকেই কবির রচনায় নতুনভাবে বাংলা ভাষা শব্দ ও রীতির ব্যবহার শুরু হয়। শব্দ নির্বাচন, প্রয়োগ, রচনায় ফুটে ওঠে এক স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। যে বৈশিষ্ট্য দিয়ে জসীমউদ্দিনের কবিতা সব পল্লীকবির কবিতার চেয়ে আলাদা হয়ে ওঠে।

বাংলা ভাষায় অন্তত এমন আর কোনো কবি নেই যিনি অন্তরের স্বত:স্ফুর্ত প্রেরণায় বাংলার শ্যামল বনভূমি ও মাটির কাছের মানুষদের নিয়ে সাহিত্যের আঙিনা ভরে তুলেছেন। তথাকথিত নিম্নকোটি মানুষদের সুখদু:খ আনন্দ-বেদনার কাহিনী নিয়ে কাব্য এবং কাব্য-উপন্যাস। পল্লীযাপনের ছবির সঙ্গে সঙ্গে পল্লী-বাংলার কথ্য ভাষাও স্বত:স্ফুর্তভাবে তাঁর লেখনীতে এসে পড়েছে। এখানেই তাঁর কবিজীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

এ বছরই ১৯৩৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’। গ্রামবাংলার অপূর্ব অনবদ্য রূপকল্প। সোজন বাদিয়ার ঘাট কাব্যের প্রধান চরিত্র সোজন ও দুলী।

তারপর তিনি ১৯৩৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানীয় ডি. লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৩ মার্চ ১৯৭৬ কবি অচিনপথের যাত্রী।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন,

‘মানুষ’ বলতেই একটা বিশেষ মানুষ আমার মনের মাঝখানে ভেসে ওঠে....যখন কবিতা লেখা হয়, নিরাকার নির্গুন মানুষে কাজ হয় না। কবিতার জন্য চাই গুণধর মানুষ। সে মানুষ এমন হবে যাকে ধরা-ছোঁয়া যাবে....আমি যেমন পাঁচ ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে দেখি, তেমনি অন্যের পাঁচ ইন্দ্রিয়কে প্রত্যক্ষভাবেই দেখাতে চাই। কবিতার জগতে সব কিছুরই হয় গড়ন নয় স্বাদ, হয় রং নয় গন্ধ, আছে- সব কিছুরই ধরা-ছোঁয়া যায় বলেই পৃথিবী শুধু পৃথিবী নয়, পৃথিবী ধরণী। জীবনের ডালে কবি নাড়া বাঁধে। (“কবিতার বোঝাপড়া” প্রবন্ধ, চতুরঙ্গ, মাঘ ১৩৬৩) ।

জসীমউদ্দীনের কবিতা প্রসঙ্গে এই কথাগুলো সম্পূর্ণ ভাবে মিলে যায়। অনায়াস ও ব্যক্তিমন্ডিত নৈপুণ্য, লৌকিক ছড়া বলার চালে অনুভূতির তীব্রতা, বিশ্বাসের গভীরতা, অন্তরঙ্গ উত্তাপ। তাঁর কবিতা লেখার ভঙ্গিটি যুগপৎ লৌকিক ও শিক্ষিত, বিদগ্ধ ও অনুভূতিময়, পরিচ্ছন্ন, অনায়াস ও সংযত। আপাত ছেলেমানুষি কবিতাগুলো তাই বয়স্ক পাঠকেরও মন ভরিয়ে তোলে। সমস্ত পাঠকের কাছে গৃহীত হয়েছেন জসীমউদ্দীন। বাংলা কাব্য জগতে তিনি এক প্রবাদ পুরুষ।
বাংলা কাব্য জগতে তিনি এক প্রবাদ পুরুষ।

বলা যেতে পারে যে, বাংলার কবি জসীমউদ্দিন লোকসাহিত্যের ঐতিহ্য পুনঃনির্মাণকাজে ব্রতী হয়েছিলেন। জসীমউদ্দীন নিজে বলেছেন, “লোকসাহিত্যকে বা লোকসঙ্গীতকে জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করার অনেক বড় ধরনের অসুবিধা আছে। কারণ প্রায়শই তা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রুচির সঙ্গে মেলে না। তাই এ ধরনের রচনার নবায়নে আমার অনেকগুলো পদ্ধতি ছিলো। আমি কখনো একগুচ্ছগান সংগ্রহ করে তার মধ্যে যেগুলো শহরের রচনার লোকদের রুচির সঙ্গে খাপখায় সেগুলোই বেছে নিতাম। গ্রাম সাহিত্য থেকে অশ্লীল বা আপত্তিকর এবং খুব অশ্লীল অংশ কেটে কুটে বাদ দিয়ে আমি তাকে ভদ্র সমাজের উপযোগী করে তুলতাম। আমি কখনো কৃষকের পর্ণকুটিরে গিয়ে হয়তো একটি লোকগীত শিখতাম। যার সুর আমাকে আকৃষ্ট করতো কিন্তু এর বাণী ছিলো স্থূল এবং অস্পষ্ট। তাই আমি এতে নতুন শব্দ যোগ করে শিক্ষিত রুচির উপযোগী করে তুলতাম। কখনো এমনও হয়েছে যে গ্রামবাসী আমাকে একখানা গান দিয়েছে সে শুধু সুরটা জানে এবং গানের দু’চার লাইন মাত্র মনে রাখতে পেরেছে। আমি ওই ভাব বজায় রেখে গানের বাকি অংশটা তৈরি করে নিয়েছি।”

“বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ক্ষীর নদী।
উইড়া যাওয়ার সাধ ছিল পাঙ্খা দেয় নাই বিধি।”...

মরমীয়া এই পল্লীগীতিটি বহু গায়কের কন্ঠে বাঙালির মন ভরিয়েছে। বিশেষত আব্বাসউদ্দিনের কন্ঠে এ গানটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল।। অসামান্য সব সঙ্গীত (জারি গান, মুর্শিদী গান) রচনা করেছিলেন জসীমউদ্দিন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, জসীমউদ্দীনের কবিতার ভাব-ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। প্রকৃতিকবির হৃদয় এই লেখকের আছে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জসীমউদ্দীনের ‘নকশি কাঁথার মাঠ’ কবিতাকে সুন্দর কাঁথার মতো করে বোনা বলে মন্তব্য করে বলেছিলেন, 'এই লেখার মধ্য দিয়ে বাংলার পল্লী জীবন আমার কাছে চমৎকার একটি মাধুর্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে।'

“এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল,
কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল !
কাঁচা ধানের পাতার মত কচি-মুখের মায়া,
তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া।”

এই কাব্যগ্রন্থের রূপাই চরিত্রটি জসীমউদ্দীন রূপায়ন করেছিলেন বাস্তবের একজন ব্যক্তিকে উপজীব্য করে, যার প্রকৃত নাম রূপা। রূপার বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার শিলাসী গ্রামে ৷ বাস্তবের রূপাও কাব্যের রূপাইয়ের মতো বলবান বীর, সেরা লাঠিয়াল ছিলেন।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকজ সঙ্গীত সংগ্রহ করতে জসীমউদ্দীন গফরগাঁওয়ে এসেছিলেন ৷ সেখানে এসে কবি তার সাহিত্যচর্চার অন্যতম সঙ্গী খ্যাতনামা সাহিত্যিক মৌলভী শেখ আবদুল জব্বারের বনগাঁও গ্রামের বাড়িতে ওঠেন ৷ এখানে অবস্থানকালে বনগাঁও গ্রামে জমির ধান কাটা নিয়ে একদিন বড় ধরণের এক দাঙ্গা (স্থানীয় ভাষায় কাইজ্জা) হয় ৷ সেই দাঙ্গায় গফরগাঁওয়ের লাঠিয়াল দলের নেতৃত্ব দেন শিলাসী গ্রামের কৃষ্ণবর্ণের হালকা-পাতলা ছোটখাটো গড়নের যুবক রূপা ৷ পল্লীকবি সেই দাঙ্গা দেখেন;  দেখেন গ্রামাঞ্চলে জমি দখলের নারকীয় দৃশ্য ৷ দেখেন লাঠিয়াল দলের নেতৃত্বদানকারী রূপার তেজোদীপ্ত ভয়ঙ্কর বীরত্ব ৷ ওই দাঙ্গা কবির মনে রেখাপাত করে ৷ নকশী কাঁথার মাঠ কাব্যের মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে সেই দাঙ্গার ঘটনা ৷ কাব্যে, রূপাইয়ের বিপরীতে সাজু নামক যে নারী চরিত্র ছিল, তিনিও বাস্তবের এক ব্যক্তিত্ব। নাম ছিল ললিতা, রূপা ললিতাকে ভালোবাসতেন।

“নকশী কাঁথার মাঠ” কবির শ্রেষ্ঠ রচনা যা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশের পর এই কাব্যগ্রন্থটি ইংরেজিতে ই. এম. মিলফোর্ড কর্তৃক অনুদিত হয় The Field of Embroidered Quilt নামে। জসীমউদ্দীনের অমর সৃষ্টি। কাব্যগ্রন্থটি ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে বিশ্বপাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলা কবিতার জগতে যখন ইউরোপীয় ধাঁচের আধুনিকতার আন্দোলন চলছিল তখন প্রকাশিত এই কাব্যকাহিনী ঐতিহ্যগত ধারার শক্তিমত্তাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। পাশ্চাত্য সভ্যতার দোলাচলে বাঙালি সভ্যতা সংস্কৃতি যখন হারিয়ে যাচ্ছে, সেই অসময়ে জসীমউদ্দিনের সৃষ্টিকর্ম আবার সেই বাংলার চিরচেনা রূপটি ফিরিয়ে দিয়েছিল। এবং বাঙালি পাঠক তাঁর সৃষ্টিকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিলেন।

মাটি আর মানুষের কবি পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। গ্রামের হাওয়া আর ধূলিকণার সাথে ভেসে বেরিয়েছে তাঁর প্রাণবন্ত ও সহজ উচ্চারণে মানুষের মনের কথা।

“আমার বাড়ি যাইও ভোমর,
বসতে দেব পিঁড়ে,
জলপান যে করতে দেব
শালি ধানের চিঁড়ে।
শালি ধানের চিঁড়ে দেব,
বিন্নি ধানের খই,
বাড়ির গাছের কবরী কলা,
গামছা-বাঁধা দই।
আম-কাঁঠালের বনের ধারে
শুয়ো আঁচল পাতি,
গাছের শাখা দুলিয়ে বাতাস
করব সারা রাতি।...”

‘আমার বাড়ি’।

একটি ছোট গ্রাম, পাশে তার কুলুকুলু রবে বয়ে যাচ্ছে ক্ষীণতোয়া নদী।  সবুজ গাছপালা ঘিরে আছে ছোট গ্রামখানিকে। গাঁয়ের পথ ধরে কলসি কাঁখে নববধু নদীর ঘাটে আসে জল ভরতে। দূরের মাঠে রাখাল বাজায় বাঁশি।
এই সুন্দর গাঁয়ের ছবি যার কবিতায় ফুটে উঠেছে দরদী ও মরমী কলমে, তিনিই আমাদের পল্লীকবি জসীমউদ্দীন।
পল্লীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পল্লীর মানুষের সুখ দুঃখের ছবি তাঁর কবিতায় বারবার প্রতিফলিত। বাংলা সাহিত্যে এত  সুন্দর করে আর কোন কবি পল্লীর চিত্র আঁকতে পারেননি।

ঠিক কোন সময়টা তাঁর সময় ? বয়সের হিসেব আর কবিতাচর্চা দিয়ে তাঁকে ঠিক কোনো দশকে আঁটানো যায় না। তবু সাল ধরে হিসেব করলে ১৯৩০ সালে কলকাতার কল্লোলগোষ্ঠী বাংলা কাব্যসাহিত্যের ক্ষেত্রে যে নবজাগরণ এবং আধুনিকতার সূচনা করেছিলেন, কবি জসীম উদ্দীনের উত্থান সেই একই সময়ে।

তবে কল্লোলগোষ্ঠীর অন্য কবিদের সঙ্গে তাঁর মৌলিক পার্থক্য। এই গোষ্ঠীর সকল কবি লেখকই ছিলেন উগ্র আধুনিকতায় বিশ্বাসী, বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করলেও তাঁদের নজর ছিল ইউরোপ অর্থাৎ পাশ্চাত্যের দিকে। একমাত্র কবি জসীম উদ্দীন ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর ভাষা ছিল সাদামাটা। কবিতা উগ্র আধুনিকার পরিবর্তে ধারণ করেছে বৃহত্তর গ্রাম বাংলার প্রকৃতি, সেখানকার সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখ, হাসি কান্না। অর্থাৎ তিনি বাইরের দিকে তাকাননি। তাকিয়েছিলেন আপন ঘর ও দেশের দিকে। আধুনিকতা বা বিশ্বনাগরিকতা কবিতা রচনার ক্ষেত্রে হয়ত জরুরী হয়ে উঠছিল, হয়ত সংঘাতসঙ্কুল উদ্ভ্রান্ত সময়ের দলিল হিসেবে কবিতা এক আবশ্যিক উপকরণ হয়ে থাকে এই বোধে জাগ্রত হচ্ছিল কবি-মানস, কিন্তু সম্ভবত জসীমউদ্দীন এই ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর কবিতা অন্তরমহলের কবিতা, তাঁর কবিতার গন্তব্য হৃদয়মুখী।

সুখপাঠ্য প্রতিটি রচনা পাঠককে অভিভূত করে তার ভাবনায়, ভাষার আশ্লেষে, তার এমপ্যাথি তৈরীর সামর্থ্যে। এত অপ্রতিকূলতার মধ্যেও কী করে অপ্রতিহত থাকে জীবন ? তাঁর কবিতায় ‘আমি’ শব্দটি বহু ব্যবহৃত, কিন্তু শব্দটি কখনোই একরৈখিক বা আত্মজৈবনিক ‘আমি’ নয়। এই আমিত্বের সংশয়ে অনায়াসে জড়িয়ে পড়ে পাঠক, অবচেতনে ‘আমি’ সরে যায় আড়ালে আর ফুটে ওঠে জীবনের নকশী কথা। এক আশ্চর্য কবিক্ষমতা। তাই জসীম উদ্দীনের কবিতা জাগিয়ে তোলে অনেক ভাব, অনেক আবেগ, অনেক ভাবনা। পাঠক হয়ে ওঠেন সহৃদয় সংবেদী।  আপাত নির্লিপ্ত অনবদ্য স্মৃতি সরণীর অনুভবে এক মিথবহুল সময়ের সাক্ষী। মনের গভীরে নির্মাণ হয় কয়েক দশকের গ্রাম-বাংলার ইতিহাস। তাঁর রচনারীতিতে আছে এক নির্ভুল স্বাক্ষর। কবির নাম না থাকলেও ঠিক বোঝা যায় এ কবিতা জসীমউদ্দীনেরই।

অসংখ্য কাব্য গ্রন্থ। রাখালী, নকশী কাঁথার মাঠ,  বালুচর, ধানখেত, সোজন বাদিয়ার ঘাট, হাসু, রঙিলা নায়ের মাঝি, রূপবতী, মাটির কান্না, এক পয়সার বাঁশী, সকিনা, সুচয়নী, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে, মা যে জননী কান্দে, হলুদ বরণী, জলে লেখন, কাফনের মিছিল এবং কবর।

প্রতি সৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে নানা খন্ডচিত্র, অত্যন্ত রোমান্টিক আবহে গড়া বৃষ্টিভেজা দিনরাত্রি কিংবা রুক্ষ অকরুণ মাটির গল্প।

১৯২১ সালে মোসলেম ভারত পত্রিকায় কবির ‘মিলন গান' নামে একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এই কবিতাটিই কবির প্রকাশিত প্রথম লেখা। ১৯২৫ সালে প্রগতিশীল সাহিত্য পত্রিকা কল্লোল-এ তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘কবর' প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী'। এর প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন ‘কল্লোল' পত্রিকার সম্পাদক দীনেশ রঞ্জন দাশ। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় কাব্য-উপন্যাস ‘নকশীকাঁথার মাঠ।'

লিখেছেন অসাধারণ কিছু নাটক। পদ্মাপার, বেদের মেয়ে, মধুমালা, পল্লীবধূ, গ্রামের মেয়ে, ওগো পুষ্পধনু এবং আসমান সিংহ। এই সব নাটকে গ্রামবাংলার সমসাময়িক চিত্র নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।

শুধু বড় মাপের কবি নন, একজন সুখ্যাত গল্পকার হিসেবেও কবি জসীমউদ্দীন চির অম্লান হয়ে আছেন। রয়েছে অসামান্য ভ্রমণকাহিনি “চলে মুসাফির”, “হলদে পরির দেশে”, “যে দেশে মানুষ বড়”, “জার্মানীর শহরে বন্দরে”। আছে উপন্যাস ‘বোবা কাহিনী’।   

বলা দরকার, কবিতা বিষয়ে কোনো অ্যাকাডেমিক আলোচনায় তিনি আগ্রহ দেখিয়েছেন এমন প্রমাণ নেই। কিন্তু ছোট ছোট সন্দর্ভ রচনার মতো করে নিজের ভাবনা ও অনুভূতির কথা জানিয়েছেন নানা বিষয়ে। সমগ্র বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে কবির আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা জাতীয় গ্রন্থগুলো  সহজ অনুপম শিল্প হয়ে উঠেছে। আত্মকথা যেমন ‘যাদের দেখেছি, ঠাকুর বাড়ির আঙ্গিনায়’, ‘জীবন কথা’, ‘স্মৃতিপট’।

কিছু হাসির গল্প ও ডালিমকুমারের মত লেখাও এই কবির সৃষ্টি।

স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হয়ে আছে সমস্ত রচনা, তার কারণ অতি আধুনিক একটি মন, মনন, চিন্তা ও সামাজিক দর্শন।

সাধারণভাবে পল্লীকবিদের কবিতা স্টিরিও টাইপ, পুনরাবৃত্তিময়,  নিয়ম এবং ছকে বাঁধা। পাঠকের সংবাদ পিপাসা ও রসতৃষ্ণাকে মেটাতে পারলেও মানুষের চৈতন্যের স্তরের বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ।  গ্রাম বাংলার মানুষের মাঝে তা পুনঃপ্রচারে কোনো উত্তরণ ঘটে না। না কবিতার উত্তরণ, না পাঠকের উত্তরণ। এখানেই কবি জসীম উদ্দীনের কবিতা পল্লীকবিতা থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা হয়ে আছে।

যদিও সমস্ত কাব্যগ্রন্থ, নাটক, উপন্যাস, সঙ্গীত, ভ্রমণ কাহিনী এবং আত্মকথা-য় গ্রামবাংলার রূপ, গ্রামবাংলার ছবি। দেশ কাল, সমাজ, মানুষ ও জীবনচিত্র। কবিতা জুড়ে রাখালিয়া সুর ও পল্লী জীবনের ভাববস্তু। আছে কথকতার ধরণ ও আখ্যান প্রবণতা।  

তবু লক্ষণীয় বিষয় এই যে, আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা সত্বেও তাঁর কবিতা  ক্ষুদ্র অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কবি জসীম উদ্দীনের কবিতা সংহত, পরিপাটি ও অনুপম শিল্প। তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, তাঁর কবিতার আঙ্গিক কৌশল। হয়ত ছন্দ বা মিল নিয়ে তেমন পরীক্ষা নিরীক্ষা নেই, কিন্তু চিত্রকল্প নির্মাণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবণতা আর দৈনন্দিন ভাষার অবিরল প্রয়োগে বিষয়ের একমাত্রিকতাকে ছাপিয়ে তাঁর লেখা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত, জীবন্ত। রোমান্টিক স্বপ্নজগত পেরিয়ে বাস্তব যাপনের সংঘাতসঙ্কুল পরিমণ্ডলের ছবি সাবলীল দক্ষতায় এঁকে ফেলেন কবি।

বুদ্ধদেব বসু একবার বলেছিলেন, কবিতা লেখাও একটা কাজ। জসীমউদ্দীনের কবিতায় শব্দ দিয়ে তৈরী ইতিহাস, ভাষা দিয়ে তৈরী গ্রাম-বাংলার সমাজ। সত্যিই একটা ‘কাজ’ হয়ে উঠেছে। নানা স্পষ্ট-অস্পষ্ট সঙ্কেত। কখনো কথা দিয়ে গান গেয়ে ওঠা, কখনো কথার ভাবে বুকের মধ্যে কান্না জমে ওঠা। চমত্কার এক নির্মাণপ্রক্রিয়া।

প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ষাটের দশকের শেষের দিকে পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার বন্ধের পদক্ষেপ নিলে সরকারের সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন। বাঙালির সত্তা বিকাশের আন্দোলনের (১৯৬৬-১৯৭১) অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার একজন দৃঢ় সমর্থক হিসেবেও ছিলেন পরিচিত।

কবি জীবদ্দশায় এবং মরণোত্তর অনেক সম্মান পেয়েছেন। তার মধ্যে অন্যতম প্রেসিডেন্টস অ্যাওয়ার্ড ফর প্রাইড অফ পারফরমেন্স ১৯৫৮, একুশে পদক ১৯৭৬, স্বাধীনতা দিবস পুরষ্কার  ১৯৭৮ (মরণোত্তর), রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট ডিগ্রি (১৯৬৯)। তবে কবি ১৯৭৪ সালে বাংলা অ্যাকাডেমী পুরষ্কার প্রত্যাখ্যান করেন।

তবে অগণিত পাঠকের তৃপ্তি হয়ত বা জসীমউদ্দীনের শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার। এই তৃপ্তি আর আগ্রহ নিয়ে আজও তাঁর কবিতার উত্‍সসন্ধান হয়। তথাকথিত কারিকুরি বা ছন্দ-মিল-শব্দবিন্যাসের চাতুর্য প্রদর্শন নয়, কবি জসীম উদ্দীনের কবিতামালা জীবনদর্শনের এক নিটোল নিবেদন। আত্ম-উপলব্ধির অবসর যাপনের সময় তাই এই পাঠে গভীর তৃপ্তি।


লেখক পরিচিতি:  আইভি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মস্থান–জামশেদপুর, ঝাড়খণ্ড। পেশায়– ব্যাঙ্ককর্মী আর নেশা- লেখালেখি, বেড়ানো ও বাগান করা। গদ্য, ছোটগল্প, বড়গল্প,উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ-কথা লিখতে ভালবাসেন। প্রকাশিত বই – নিরবলম্ব (উপন্যাস), রাতপাখি এবং অন্যান্য (ছোটগল্প সঙ্কলন), ছায়াতে আলোতে (ছোটগল্প সঙ্কলন),অপারেশন স্বর্গদ্বার (উপন্যাস), অনির্বাণ এবং (ছোটগল্প সঙ্কলন), রামধনুর দেশে (ছোটদের জন্যে গল্প সঙ্কলন),ভাবনার নানা প্রসঙ্গ (প্রবন্ধ সঙ্কলন) নদী যেমন (ছোটগল্প সঙ্কলন) মহাজীবন (ছোটগল্প সঙ্কলন)।                 

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.