অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


পুরনো লেখা - ফিরে পড়া

নভেম্বর ১, ২০১৭

প্রশ্নের রবীন্দ্রনাথ

সুমিত রায়

প্রশ্ন, "প্রশ্ন" নিয়ে রবীন্দ্রনাথ খেলা করতেন তাঁর কবিতায়, তাঁর গানে।

প্রথমেই যে উদাহরণটা মনে আসা উচিত, আমাদের কালে নব্বই শতাংশ স্কুলের ছাত্র সেটি জানতো। বুঝতো না, কিন্তু জানতো। সেটি হবে সেই

"যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো
তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?" [প্রশ্ন, পরিশেষ]

সরাসরি প্রশ্ন, কে করছে -- কবি, কাকে করছে -- ভগবান, কেন করছে -- হাড় ভাজা ভাজা হয়ে গিয়েছে বলে। কী উত্তর? -- নিরুত্তর। আরে মশায় আর ইয়ার্কি দেবেন না, একে আবার প্রশ্ন বলে নাকি? এতো হলো আলঙ্কারিক প্রশ্ন, সোজা বাংলায় rhetorical question, এর কোনো জবাব নেই হয়না, হতে পারে না। নাছোড়বান্দা ছাড়েন না, -- কী উত্তর? -- নিরুত্তর, ভগবান নিরুত্তর। অনেক সুকুমারমতি লোক কবিতা মারফৎ ভগবানের এই বেইজ্জতি সহ্য করতে পারেন না তাঁরা রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়াই ছেড়ে দেন, যেমন স্বর্গত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আমি আবার এক গুণ্ডার দলের খপ্পরে পড়েছি, তারা মাইনে নিয়ে উত্তর দেবার কাজ ঠিকমতো না করার অপরাধে ভগবানকে যত্রতত্র বরখাস্ত করে বেড়ায়।

কবিতাতে এরকম আরো বেশ কিছু খেলা আছে কিন্তু আমি গানের কথা বলবো। গানে এই রহস্যের ব্যাপারটা আর একটু সূক্ষ্মভাবে খেলানো যায় বলে আমার বিশ্বাস। কারণ গানে শীর্ষনামের অশান্তি নেই, গানে কথার কসরৎ করার জায়গাও কম, ওই তো আস্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী আর আভোগী মাত্র, আবার সুরের আড়ালে সব কিছু লুকিয়ে রাখা যায়। যদিও রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সেটা চাননি, তিনি "সুরের উপর কথাকে দাঁড় করাইতে" চেয়েছিলেন। । আর রবীন্দ্রনাথকে এমন জাদুর মন্তর শিখিয়ে আর রক্ষা আছে।

কয়েকটা উদাহরণ বার করে দেখা যাক এই কবি কী বলতে চান। প্রথম গানটায় প্রশ্নটা খুব সরাসরি:

"না বাঁচাবে আমায় যদি, মারবে কেন তবে?
কিসের তরে এই আয়োজন এমন কলরবে?"

১৩২১ সালে সুরুল থেকে শান্তিনিকেতন যাবার পথে কবি এই গান লিখলেন, তাঁর বয়েস তখন তিপান্ন বছর, জীবন তাঁকে তখন অনেক আঘাত দিয়েছে। কাজেই তিনি জানেন যে তাঁকে বারবার, অনেকবার মারা হয়েছে, আবার নতুন করে মারবার জন্য বাঁচিয়ে তোলাও হয়েছে। কবি এটাও জানেন অগ্নিবাণে তূণ ভরে, চরণভরে ধরা কাঁপিয়ে এই যেজন মরণ মহোৎসবে মেতেছেন -- সে তাঁর ঈশ্বরই হোন বা জীবনদেবতাই হোন -- তিনি মুকুট পরতে ভালো বাসেন এবং

"এই যে আমার ব্যথার খনি জোগাবে ওই মুকুটমণি"

অতএব মুকুটমণির সরবরাহ দেবার জন্য কবিকে আবার বাঁচিয়ে তুলতেই হবে। প্রশ্নটা এখানে একেবারেই আলঙ্কারিক।

ব্যাপারটা এবার আর একটু ঘোরালো করা যাক। ১৩২০ সালের আশ্বিন মাসে সাহানা রাগ / একতালে গান লিখছেন

"যদি প্রেম দিলে না প্রাণে"

লিখছেন শান্তিনিকেতনে বসে, কবির বয়স বাহান্ন। গীতবিতান সঙ্কলন করার সময় গানটি ন্যস্ত করছেন পূজা-সুন্দর পর্যায়ে। পরে স্বকৃত ইংরেজী অনুবাদে তা দাঁড়াচ্ছে "If love be denied me"। ইংরেজীটা মনে রাখবেন, এটা কবির নিজের ভাষ্য। যদি প্রেম দিলে না প্রাণে, তাহলে হচ্ছেটা কী ? গানের আস্থায়ী-অন্তরায় বলছেন তারার মালা গাঁথা হয়ে যাচ্ছে, হচ্ছে ফুলের শয়ন পাতা, আবার দখিন হাওয়া কানে কানে গোপন কথা জানিয়ে যাচ্ছে -- সবই নিসর্গের ব্যাপার। এ তো হতেই পারে, অনুভূতিহীন হৃদয়ে এসব নৈসর্গিক ঘটনা কোনো দাগ না রাখতেই পারে। সোজা প্রশ্ন, সহজ উত্তর। কিন্তু এহ বাহ্য। সঞ্চারী-আস্থায়ীতে সেই একই প্রশ্ন করছেন, কিন্তু এবার যে সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করছেন তার মধ্যে প্রকৃতি ছাড়াও কোথা থেকে একটা মানুষ এসে ঢুকে গেছে, সে মানুষটার নাম আমি, দেখছি তার পাগল হৃদয় খনে খনে অকূলে তরী ভাসিয়েই যাচ্ছে। তখন জিজ্ঞাসা করতেই হয়, এ কেমন সৃষ্টিছাড়া কথা বাপু, প্রেমহীন প্রাণ নিয়ে কোন মূর্খ এরকম কাজ করতে যাবে? কবি যখন গান থামালেন তখন সেই অমল প্রশ্নটির উত্তর কি পাওয়া গেলো? If love be denied me তার উত্তর কি হবে but love has not been denied you my buddy প্রাণে যে প্রেম দেওয়া হয়নি, একথা তোমাকে কে বলেছে? এভাবে দেখলে একেবারে শাস্ত্রীয় মতের আলঙ্কারিক প্রশ্ন কিনা বলুন?

আধ্যাত্মিক আর আধিদৈবিক হলো, এবার একেবারেই মাটির কাছাকাছি একটা আধিভৌতিক গান বেছে নেওয়া যাক। প্রশ্ন করছেন কবি স্বয়ং, প্রশ্ন করছেন তাঁর প্রিয়াকে, যে প্রিয়া তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে। কী করে জানলাম, জানলাম কেননা গানে প্রথম চরণেই বলে দিলেন:

"একদা তুমি প্রিয়ে"

১৩২৪ সালে কবির বয়স তখন ছাপান্ন, গানের সুর আমাদের রোজকার জানাশোনা কাফি, তালটা কবির নিজের সৃষ্টি -- অর্ধঝাঁপ। তো একদা তুমি প্রিয়ে কী করেছো? না:

আমারি এ তরুমূলে
বসেছ ফুলসাজে সে কথা যে গেছ ভুলে॥

সোজা বর্ণনা, "ফুলসাজে"-র ব্যঞ্জনা অনির্বচনীয়। প্রশ্ন? কই আমি তো কোনো প্রশ্ন দেখছি না। প্রশ্নের বদলে আছে একটা কঠিন সত্য: সে কথা যে গেছ ভুলে, ভুলে গেছ, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, একেবারে উলঙ্গ সত্য।

পাছে সেই চলে-যাওয়া প্রিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার যান তাই অন্তরা থেকে সাক্ষী পেশ করতে শুরু করেছেন কবি:

সেথা যে বহে নদী নিরবধি সে ভোলে নি,
তারি যে স্রোতে আঁকা বাঁকা বাঁকা তব বেণী,
তোমারি পদরেখা আছে লেখা তারি কূলে।
আজি কি সবই ফাঁকি-- সে কথা কি গেছ ভুলে।

অন্তরার শেষ লাইনটা দেখুন, প্রশ্নবোধক চিহ্ন না থাকলেও আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না যে এটি প্রশ্ন ছাড়া আর কিছু নয়। সে কথা "যে" গেছ ভুলে আর নয়, এখন সে কথা "কি" গেছ ভুলে। নদী তো হলফ করে বলেই দিচ্ছে, নদী কি মিথ্যে কথা বলছে? একজন সাক্ষীতে কুলোবে না তাই কবি সাক্ষীদের লাইন করে দাঁড় করাচ্ছেন সঞ্চারী আর আভোগীতে --

গেঁথেছ যে রাগিণী একাকিনী দিনে দিনে
আজিও যায় ব্যেপে কেঁপে কেঁপে তৃণে তৃণে।
গাঁথিতে যে আঁচলে ছায়াতলে ফুলমালা
তাহারি পরশন হরষন- সুধা-ঢালা
ফাগুন আজো যে রে খুঁজে ফেরে চাঁপাফুলে।

তৃণে তৃণে ব্যাপ্ত কাঁপন, ফাগুন মাস, চাঁপাফুল -- এ সব সাক্ষী।

এসব সাক্ষীর ঝামেলা চুকলে শেষ চরণে আবার সেই প্রশ্ন :

আজি কি সবই ফাঁকি-- সে কথা কি গেছ ভুলে॥

এ একেবারেই আলঙ্কারিক প্রশ্ন, এর একটাই উত্তর হতে পারে, বিশ্বাস না হয় সাক্ষীদের আবার জেরা করুন। "কয়েক বছর আগেই তো ঘটে গেছে এক চিরবিচ্ছেদ, মর্মান্তিক ব্যবধান, 'কে দিয়েছে হেন শাপ, কেন ব্যবধান', দান্তে-বিয়াত্রিচের বিচ্ছেদ-বেদনার পর বোধ হয় বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যময় আরেকটা ব্যবধানের অভিজ্ঞতা। এই গানটা লিখবার বছর তিনেক আগেই যে কাদম্বরী দেবীর পুরোনো একটা ছবি হঠাৎ হাতে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের, এবং তার পরেই লেখা হয়েছিল অতিখ্যাত সেই 'তুমি কি কেবলি ছবি'। " -- লিখছেন শঙ্খ ঘোষ "দামিনীর গান" বইতে।

এই প্রশ্নের খেলায় রবীন্দ্রনাথকে হারানো অসম্ভব বললেই হয়। সম্পূর্ণ অতর্কিতে প্রশ্নের শব্দভেদী ছুঁড়ে কী করে পাঠক / শ্রোতাকে বিস্মিত আর বিমুগ্ধ করে ফেলা যায় তা এই গানটাতে দেখুন। আস্থায়ী-অন্তরা ঘুরে আমরা এক হতভাগ্যের কথা জানতে পারছি নানা রঙের দিন যার কথা শুনলো না, গান শিখলো না, সোনার খাঁচার মায়ায় না ভুলে উড়ে গেছে। ব্যর্থতার ব্যথা নিয়ে লেখা এক সাদামাটা কাহিনী। রবীন্দ্রনাথের বেশীর ভাগ গানের মতোই পরিস্থিতি ঘোরালো হতে আরম্ভ করে সঞ্চারীতে এসে (সাঙ্ঘাতিক সঞ্চারী বলে সাধে) যখন এই সাদামাটা সংবাদ-বিবরণীতে স্বপ্নের রঙ লাগে:

স্বপন দেখি, যেন তারা কার আশে
ফেরে আমার ভাঙা খাঁচার চার পাশে--
সেই-যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।

একটা কিছু অলৌকিক ঘটতে চলেছে, আমাদের মন উতলা হয়ে ওঠে। আর রবীন্দ্রনাথ তখনই একটা নয়, দুটো নয়, একসঙ্গে তিনটে প্রশ্ন পাঠক / শ্রোতাদের দিকে ছুঁড়ে মারেন:

এত বেদন হয় কি ফাঁকি।
ওরা কি সব ছায়ার পাখি।
আকাশ-পারে কিছুই কি গো বইল না--

উত্তর দিন এই তিন প্রশ্নের, দিন কী উত্তর দেবেন। হ্যাঁ বলতেও বাধবে, বাধবে না বলতেও, নীরব হয়ে রবীন্দ্রনাথের ঐন্দ্রজালিকতায় রুদ্ধবাক হয়ে বসে থাকতে হবে। প্রসঙ্গত এ গান লিখেছেন ১৩২৫ সালে, সাতান্ন বছর বয়সে। সুর ইমন-পূরবী, দুটোই সন্ধ্যার কাছাকাছি রাগ, পূরবীতে দিনশেষের বিষণ্ণ মায়া, ইমনে রাত্রের শৃঙ্গারের বেদনামধুর প্রতীক্ষা।

এই পর্যন্ত লিখে সজল চক্ষে বসে আছি, তাইতো আমার দিনগুলোও তো এমনি উড়ে গেলো কোথায় কে জানে, এমন সময় দুড়দাড় করে পোনুর প্রবেশ। পোনুর মাঝারী সাইজের পরিচয় এ লেখার শেষে দিচ্ছি, এখনকার মতো এটুকু জানলেই চালবে যে দুমদাম বেফাঁস কথা বলে লোককে বিপদে ফেলাটা পোনুর বিশেষত্ব। তাছাড়া ওর প্রায় অন্তিম পর্যায়ের টেগোরাইটিস, কিছুদিন আগে টোরোণ্টোয় বঙ্গ সম্মেলনে গিয়ে স্টেজে আমাদের বটতলাশ্রীকে দেখে এতো উত্তেজিত হয়ে পড়ে যে মাথায় জলটল ঢেলে ঠাণ্ডা করতে হয়। আমি খুব সন্ত্রস্ত, আমার লেখায় কী ভুল দেখে কী কাণ্ড বাধাবে কে জানে। প্রসঙ্গত পোনুর সঙ্গে আমার একটা জেনেটিক সম্পর্ক আছে তা যতোই দূর সম্পর্ক হোক না কেন। তা পোনু সেদিকেই গেলো না, আমার লেখায় একটু চোখ বুলিয়ে বললে, কী স্যার, রবীন্দ্রনাথের মারাত্মক দ্ব্যর্থকতাবোধের ব্যাপারটা যে একেবারে চেপে গেছেন দেখছি। তারপর বোধহয় আমার মুখ দেখে দয়া হলো, বললে যাকে সায়েবরা double entendre বলে, বুঝলেন না। এই একটা উদাহরণ দিচ্ছি। বলে খাতা খুলে লিখলে:

দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে-
বাতাস বহে মরি মরি, আর বেঁধে রেখো না তরী-
এসো এসো পার হয়ে মোর হৃদয়মাঝারে॥
তোমার সাথে গানের খেলা দূরের খেলা যে,
বেদনাতে বাঁশি বাজায় সকল বেলা যে।
কবে নিয়ে আমার বাঁশি বাজাবে গো আপনি আসি
আনন্দময় নীরব রাতের নিবিড় আঁধারে॥

ঠিক কী ঘটছে বোঝবার আগেই বললে, এই গানটা তো শুনেছেন, ১৩২০ সালে শান্তিনিকেতনে লিখেছেন কবি, তাঁর বয়েস তখন বাহান্ন বছর। রাগটা সেই ইমন, শৃঙ্গাররসের মধুর আভাস। গীতবিতানে রাখলেন পূজা-গান পর্যায়ে। খেয়াল করে দেখুন, আমি কিন্তু দ্বিতীয় লাইনটা বাদ করে দিয়েছি। এবার পড়ে বলুন এটা পূজার গান, নাকি প্রেমের গানও হতে পারে? পূজার, সেটা বোঝা সহজ, কিন্তু এই তুমিটি যদি ওপারে দূরে চলে গিয়ে শুধু স্মৃতিতে বাসা করে থাকেন তাহলে ইনি মানুষ বা মানুষী হতে পারেন। পোনু সিধে কথার মানুষ, ঢাকঢাক গুরগুর নেই, সে বললে এই তুমিটা তো বৌঠানও হতে পারেন, কবিতার কোথাও তা বন্ধ করার মতো কিছু বলা হয়েছে কি? আঙুল বুলিয়ে মিলিয়ে দেখলাম, নাঃ সত্যি কিছু নেই যাতে এটি বৌঠানের উদ্দেশে রচিত নয় তা বলা যেতে পারে। পোনু বললে গানটার এবার দুটো কপি করুন, একটা জীবনদেবতার আর একটা বৌঠানের। এবার অভিধান খুলে দেখে রাখুন যে "চরণ" শব্দের দুটো অর্থ হতে পারে, তার একটি তো পদ, পাদপদ্ম আর অন্যটি শ্লোকের একটি পদ বা গানের একটি লাইন। এবার দ্বিতীয় যে লাইনটি কেটে লুকিয়ে রেখেছিলাম

আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই নে তোমারে॥

সেটার এক কপি এক কপি করে দুই জায়গায় লাগিয়ে দিন। বলতে যাচ্ছিলাম যে তোমার এই কায়দা মুর্গ মুসল্লমের রেসিপির মতো শোনাচ্ছে কিন্তু তার আগে গানের দুই কপি দেখে মাথা ঘুরে গেলো। দুই গানেরই কোনো পরিবর্তন হয়নি, মানে এই লাইনটা লাগাবার পরেও জীবনদেবতার গান তাঁরই আর বৌঠানের গানও বৌঠানের। পোনু বললে ব্যাপারটা বুঝছেন তো, চোখের সামনে পুকুর চুরি করে গেলেন, আমজনতা গানটি পূজা পর্যায়ের দেখেই ভক্তিমূলক গান ধরে বসে রইলো| তন্ত্রের গুহ্য ব্যাপারটা তাদের মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেলো।

পোনু বললে দেখুন দাদা, এইসব গুজব আর কুৎসার মধ্যে বাস করাতে রবীন্দ্রনাথ অভ্যস্ত ছিলেন। ঢালা সাপ্লাই ছিলো তো তখন, একা দ্বিজুবাবুই একশো, অশ্লীলতাদোষ থেকে "বৌদিবাজী"র কাহিনী "আনন্দ বিদায়", ওদিকে সুরেশ সমাজপতির সাধুভাষায় ভর্ৎসনা, এমন আরো কত কী -- রবীন্দ্রনাথ গজেন্দ্রর মতো তার মধ্যে দিয়ে পার হয়ে গেছেন, শেষরাতে ওস্তাদের মারটি গুছিয়ে রেখে। কাজেই আজকের বটতলাশ্রীর চটি বা সুমন ঘোষের কাদম্বরী ওসব রবীন্দ্রনাথকে বিশেষ বিচলিত করে না। আর তাছাড়া তিনি আজ প্রায় পঁচাত্তর বছর গতাসু।

সুরেশ সমাজপতির কথা বলছিলাম, এই দেখুন না এই "দাঁড়িয়ে আছ" গানটা নিয়ে তিনি কী বলেছেন:

"...রবীন্দ্রনাথ গাহিয়াছেন,-- 'দাঁড়িয়ে আছ ... আমি পাইনে তোমারে॥' "চরণে" শ্লেষ আছে। এতগুলি চরণ সত্ত্বেও গানটি যে খোঁড়া হইয়াছে, তাহা হইতেই সপ্রমাণ হইতেছে, সুরগুলি চরণ পাইবামাত্র তাহাদিগকে ব্রহ্মসঙ্গীতের ময়দানে ছাড়িয়া দিলেও কোনো লাভ নাই।"
-- সাহিত্য পত্রিকা জ্যৈষ্ঠ ১৩২১

দেখলেন তো, সমাজপতির মতো ধুরন্ধর সমালোচককেও রবীন্দ্রনাথ ধোঁকা দিলেন, সমাজপতি চরণের শ্লেষ ধরতে পেরেও এ যে বৌদিকে লেখা প্রেমপত্র তা ধরতে পারলেন না, কাজেই ওসব নিয়ে আপনি ভেবে ভেবে শরীরপাত করবেন না।

পোনুর পরিবর্তন দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। বছর দশ আগে যখন অ্যাটলাণ্টিক সিটির বঙ্গসম্মেলনে রবীন্দ্রনাথের স্মরণসভায় আমরা স্টেজে মাতাল নাচিয়েছিলাম তখন এ ছেলের নাকে জুতো পুড়িয়ে ধোঁয়া দিতে হযেছিলো। টোরোণ্টো বঙ্গ সম্মেলনের কথা তো আগেই বলেছি। আসলে টেগোরাইটিসের কৃপায় ও আমাদের থেকে আরো তাড়াতাড়ি প্রাপ্তবয়স্ক হযে যাচ্ছে, একদিন আমাকে ছাড়িয়ে যাবে। সে ঠিক আছে, পুত্র আর শিষ্যের কাছে পরাজয়ে লজ্জা নেই।

আপনারা রবীন্দ্রসঙ্গীত গুণ্‌গুণ্‌ করতে করতে এই প্রশ্নের খোঁজ করবেন, তেমন ভালো কিছু দেখলে আমাকে জানিয়ে দেবেন।

১] এখানে ব্যবহৃত তথ্য www.gitabitan.net - তে দেখা যেতে পারে।
২] প্রণবকুমার দাস, ওরফে পোনু এক অকালপক্ক কিশোর, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় (ব-ভ--ম) মশায়ের মানসপুত্র। সে ভগবানকে যুক্তাক্ষরবর্জিত চিঠি লিখে তার তল্লাটের সব বড়োদের কেচ্ছা জানিয়ে এক সময় ভদ্রলোকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিলো। বয়ঃপ্রাপ্ত হবার পর সে উধাও, তবে পোনু নামে এক দুর্বৃত্ত তরুণ মাঝে মাঝে আমেরিকার পূর্বাঞ্চলে এসে ওই পোনুর মতোই উটকো কথাবার্তা বলে লোকজনকে উত্যক্ত করে যায়। এদের দুজনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা আমাদের আর জানা হয়ে ওঠেনি।

['দুকূল' পত্রিকায় পূর্বপ্রকাশিত]


লেখক পরিচিতি: পাঁচ দশক হোলো আমেরিকাবাসী। চাকরীজীবনে তথ্য- ও সংযোগপ্রযুক্তি বিপ্লবী, যদিও পদাতিকমাত্র। অবসর নেবার পর কিছু লেখালেখি করে থাকেন। ঘোর রবীন্দ্রপ্রেমী, নিউ জার্সিতে এক রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখার স্কুল ও তিনটি সফল রবীন্দ্রমেলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গীতবিতান.নেট রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর জ্ঞানকোষ মাত্রার এক বিস্ময়কর ওয়েবসাইট, সার্ধশতবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাঞ্জলি। "অবসরের" সঙ্গে জন্মকাল থেকে নানাভাবে যুক্ত।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.