অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


বইয়ের খবর

নভেম্বর ১, ২০১৭

 

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত-র “অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র”

ঋজু গাঙ্গুলী


সময়টা গত শতাব্দীর দুয়ের দশক।

বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্য তখন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার রায়, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, যোগীন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখের কলমে ছড়া, কবিতা, রূপকথা, ঐতিহাসিক, সামাজিক, হাসি-মজার গল্পে সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। কিন্তু অভাব ছিল এমন লেখার, যা পাঠকের মনে রহস্য-রোমাঞ্চ এবং বিস্ময়ের অনুভূতির জন্ম দেবে।

আলেকজান্ডার দুমা ও জুল ভের্নের মাধ্যমে ফরাসি ভাষায় এমন সাহিত্য ততদিনে জনচিত্ত জয় করেছে। রবার্ট লুই স্টিভেনসন, এইচ.জি.ওয়েলস, এইচ রাইডার হ্যাগার্ড-এর লেখায় ‘পেনি ড্রেডফুল’-এর গণ্ডি পেরিয়ে অ্যাডভেঞ্চার সাহিত্য ততদিনে ইংরেজিতেও এতটাই জনপ্রিয় যে বেকার স্ট্রিটের ঘরে বসে বা লন্ডনের উপকন্ঠে কোথাও গিয়ে রহস্যভেদ করা কনসাল্টিং ডিটেকটিভের কার্যকলাপও পাঠকের কাছে আসছে অ্যাডভেঞ্চার নামে।

বাংলায় এই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য কলম ধরলেন এমন এক সাহিত্যিক যিনি ততদিনে সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় আপন কৃতিত্বে ভাস্বর হয়ে উঠেছেন, অথচ বাংলায় অ্যাডভেঞ্চার সাহিত্যের পথিকৃৎ হয়ে ওঠার পর এই বিশেষ ঘরানায় তাঁর লেখা এতই জনপ্রিয় হল যে বাঙালি তাঁর অন্য সব সাহিত্যকর্ম একেবারে ভুলে গেল!

আমি হেমেন্দ্রকুমার রায়-এর কথা বলছি, যিনি ‘মৌচাক’ পত্রিকায় ১৩৩০-১৩৩১-এ “যকের ধন”, এবং ১৩৩৮-৩৯-এ “আবার যখের ধন” লিখে বাংলা সাহিত্যে অ্যাডভেঞ্চার সাহিত্যের কার্যত একটি টেমপ্লেট তৈরি করে দেন।

এই বইগুলোয় কল্পনাপ্রবণ, ভাবুক, বন্ধুবৎসল কুমার শক্তি ও বুদ্ধিতে অগ্রসর বিমল-কে যে কথাটি বলে সাবধান করে দিত (ডানপিটের মরণ যে গাছের আগায়!) ১৩৪২-৪৩-এ “চাঁদের পাহাড়” এবং ১৩৪৮-৪৯-এ “হীরামাণিক জ্বলে” লিখে বিভূতিভূষণ সেটাই আরো জোরালো করে দিলেন: “ছাদের আলসের দিব্যি চৌরস একখানা টালি হয়ে অনড় অবস্থায় সুখে-স্বচ্ছন্দে থাকার চেয়ে স্ফটিক প্রস্তর হয়ে ভেঙে যাওয়াও ভালো” নামক চিনা প্রবাদটি বলে।

কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা সাহিত্যে অ্যাডভেঞ্চার পিছু হটে গিয়ে জায়গা করে দিল বনমালি নস্কর লেনের বাসিন্দা এক শীর্ণকায় ‘মুখেন মারিতং জগৎ’ ব্যক্তির কাণ্ডকারখানাকে, যিনি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে হেলায় হারান দুর্ধর্ষ দুশমনদের। হয়তো সেজন্যই সত্যজিতের গল্পে বেস্টসেলার লেখকের নায়কের কার্যকলাপে রহস্যভেদের বদলে উষ্টুম-ধুষ্টুম অ্যাকশন-ই হয়ে দাঁড়ায় মুখ্য।

সত্যজিৎ নিজে অবশ্য প্রফেসর শঙ্কুর নানা রোমাঞ্চকর কাহিনি আমাদের উপহার দিয়েছিলেন, যেসব বিজ্ঞান-সুবাসিত ফ্যান্টাসির পড়তে গিয়ে আমরা অন্তত কিছুক্ষণের জন্য পরীক্ষা আর হোমটাস্ক ভুলে “জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য, চিত্ত ভাবনাহীন” এমনটা ভাবার সুযোগ পেতাম।

তারপর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর কলমে সন্তু-কাকাবাবুর প্রথম দিকের কাহিনিগুলো বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে অ্যাডভেঞ্চারের ক্ষেত্রে একটা নতুন ঘরানা নিয়ে আসে। “ভয়ঙ্কর সুন্দর”, “পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক”, “সবুজ দ্বীপের রাজা”, এই প্রতিটি কাহিনিই ইতিহাসের বা বিজ্ঞান জগতের কোনো-না-কোনো সমাধান না-হওয়া রহস্যের একটা নিজস্ব উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। ওই সিরিজে এমনকি এও বলা হয়েছিল যে কাকাবাবু কোনো দলের সদস্য না হয়ে, বরং একাই বারমুডা ট্র্যাংগেলের রহস্যভেদ করার চেষ্টা করতে, অথবা এল ডোরাডো খুঁজে বের করার জন্য অভিযানে যেতে রাজি আছেন! অর্থাৎ, এই পৃথিবীর যেক’টা কোণ এখনও মানুষের দাপটের সামনে নিজের ঝুলি উজাড় না করে দিয়ে কিছু কথা, কিছু সত্যি লুকিয়ে রেখেছে, সেই জায়গাগুলোর যেতে তৈরি ছিলেন জেদি, অসমসাহসী, বুদ্ধিমান, নীতিনিষ্ঠ মানুষটি।

ঠিক এই ঘরানাতেই লিখেছেন এই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় সাহিত্যিক হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত, যাঁর লেখাগুলো সঙ্কলিত হচ্ছে দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত “অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র”-র খণ্ডে-খণ্ডে, আর তাদের নিয়েই আজকের ‘বইয়ের খবর’।



বইয়ের নাম: অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ১ ও ২
 লেখক: হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
 প্রকাশকাল:
o প্রথম খণ্ড: ডিসেম্বর ২০১৫
o দ্বিতীয় খণ্ড: জানুয়ারি ২০১৭
 হার্ডকভার, প্রথম খণ্ডের পৃষ্ঠাসংখ্যা ৩১০, দ্বিতীয় খণ্ডের পৃষ্ঠাসংখ্যা ২৮৮
 প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ: রঞ্জন দত্ত
 দুটি খণ্ডেরই মূল্য ৩০০/- টাকা

এই দুটি বইয়ে যেসব কাহিনি স্থান পেয়েছে, তাদের নিয়ে আলোচনার আগে যে তিক্ত কথাগুলো বলতে বাধ্য হচ্ছি, সেগুলো লিখি:

 দুটি বইয়েরই ছাপা অত্যন্ত বাজে। আনন্দ পাবলিশার্স বা পত্র ভারতী-র বইয়ে ফন্ট-সাইজ অনেক বড়ো হয়, ছাপাও হয় অনেক পরিষ্কার। পাতার মান ভালো হলেও ফন্ট-সাইজ এমন হলে আজকের শিশু-কিশোর পাঠকের মন জয় করা অসম্ভব। ‘ক্যাম্প হাফ-ব্লাড ক্রনিকলস’ বা ‘কিপার অফ দ্য লস্ট সিরিজ’ পড়তে অভ্যস্ত আজকের ছোটোরা কনটেন্টের আগে দেখতে চাইবে বই কতটা দর্শনধারী, আর সেখানে লড়াই শুরু আগেই হেরে যাবে এই বইগুলো।

 কপি-এডিটর হিসেবে দে’জ পাবলিশিং-এর মতো নামকরা প্রতিষ্ঠান কাউকে নিয়োগ করতে পারেনি দেখে বড়ো কষ্ট হল। অজস্র টাইপো, ভুল বানান, এবং সামগ্রিক অযত্নে একেবারে কলঙ্কিত হয়ে রয়েছে এই বইয়ের প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠা।

 রঞ্জন দত্ত-র প্রচ্ছদ চলনসই, কিন্তু বইয়ের ভেতরে অলঙ্করণ হিসেবে লেখাগুলো প্রকাশের সময় সঙ্গত করা ছবিগুলো, এমনকি রঙিন-এর বদলে সাদাকালো চেহারায় নিলেই বইটা সুন্দর হত।

 শব্দসীমা ও অন্যান্য কারণে লেখাগুলো প্রথম প্রকাশের সময় কিছুটা রাশড থাকেই, বিশেষত শেষ করার সময়। সমগ্র প্রকাশের সময় লেখক সেগুলোকে সামান্য পরিমার্জনা করবেন এমন আশা করেছিলাম, কিন্তু দেখলাম তিনি তেমন কিছুই করেননি।

 বইদুটো কিছুমাত্র সম্পাদনা করা হয়নি। লেখক দুটি বইয়েই অত্যন্ত বোরিং ভূমিকায় যা লিখেছেন তাতে এই লেখাগুলোর সম্বন্ধে প্রায় কোনো প্রাসঙ্গিক তথ্যই দেওয়া হয়নি, যেটুকু লেখা হয়েছে তাতেও প্রচুর ভুল।

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত-র যে লেখাগুলো এই দুটি খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাতে মূলত দু-ধরনের অ্যাডভেঞ্চার রয়েছে। তারা হল:

• জার্মান ক্রিপটোজুলজিস্ট হেরম্যান ও তাঁর ভারতীয় বন্ধু তথা সঙ্গী সুদীপ্ত-র পৃথিবীর নানা দুর্গম প্রান্তে গিয়ে ক্রিপটিড, অর্থাৎ এখনও শুধুমাত্র কিংবদন্তির বিষয় হয়ে আছে, অথচ তাদের অস্তিত্বের কোনো ভৌত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, এমন প্রাণীদের অন্বেষণের গল্প।

• স্পেনের ক্যানারি ইউনিভার্সিটিতে মেসো-আমেরিকান সভ্যতার ইতিহাসের অধ্যাপক জুয়ান ও তাঁর ভারতীয় বন্ধু তথা সঙ্গী দীপাঞ্জন-এর নানা দেশে ভ্রমণের সুবাদে রহস্য ও বিপদের মুখোমুখি হওয়ার গল্প।

প্রথম খণ্ডে যেসব উপন্যাস স্থান পেয়েছে তারা হল:

(১) বুরুন্ডির সবুজ মানুষ: এই উপন্যাসটি ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় মে ২০১১ থেকে শারদীয়া ২০১৩ অবধি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। ফেব্রুয়ারি ২০১৪-য় লেখাটি হিমাদ্রি ভট্টাচার্যের অনবদ্য অনুবাদে পাওয়ার পাবলিশার্স থেকে ‘দ্য গ্রিন এপ’ নামে ইংরেজিতে গ্রন্থবদ্ধ হয়। লেখাটিতে আমরা দেখি হেরম্যান ও সুদীপ্তকে বুরুন্ডির গ্রেট রিফট এলাকার বিপদসঙ্কুল পাহাড়-জঙ্গলে নানা পুঁথি ও কথায় শোনা দৈত্যাকৃতি এক সবুজ বানরের সন্ধানে যেতে। এই গল্পটি চমৎকার। রহস্য, রোমাঞ্চ, অ্যাকশন, দুষ্টের দমন, এবং গল্পের কেন্দ্রে থাকা বেদনাঘন ঘটনাটি নিয়ে লেখাটা আজকের পাঠককে আকৃষ্ট করবেই। কিন্তু দুটো সমস্যা লেখাটিকে দুর্বল করে দিয়েছে: লেখার ভাষা মাঝেমধ্যেই অত্যন্ত ফ্ল্যাট ঠেকে। গল্প যতক্ষণ গতিময়, ততক্ষণ সেদিকে নজর পড়ে না, কিন্তু বুদ্ধদেব গুহ-র ঋজুদার গল্পগুলোর মতো ইনফোডাম্পিং হলেই ব্যাপারটা খুব বাজে লাগে। গল্পের মধ্যে অলঙ্করণ না থাকলে যে অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি নেতিয়ে পড়তে চায়, এটা টের পাওয়া যায় এই লেখাটা পড়তে গিয়েই।

(২) সুন্দাদ্বীপের সোনার ড্রাগন: ৫ই জুলাই ২০১০-এ ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকায়, এবং জুন ২০১১-য় পারুল প্রকাশনী থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত এই উপন্যাসটিই হেরম্যান ও সুদীপ্ত-র প্রথম প্রকাশিত অ্যাডভেঞ্চার। ইন্দোনেশিয়ার এক কোমোডো ড্রাগন এবং হিংস্র উপজাতি অধ্যুষিত এলাকার দ্বীপে কিংবদন্তির সোনার ড্রাগন খুঁজতে গিয়ে সাঙ্ঘাতিক বিপদের সম্মুখীন হতে হয় এই জুটিকে। গল্পের গতি, ‘হিরে মানিক জ্বলে’-র স্পষ্ট প্রভাব, এবং সংক্ষিপ্ত আকারের জন্য এই লেখাটি একবার পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না।

(৩) শেবা মন্দিরের সিংহ মানুষ: ২০১৪-র শারদীয়া ‘শুকতারা’-য় প্রকাশিত হয় এই উপন্যাসটি। মিশরের অজস্র কিংবদন্তি তথা বিশ্বাসে প্রতিধ্বনিত হয়েছে সিংহ-মানুষের কথা। তেমন কিছু কি সত্যিই আছে সুদান সীমান্তের কাছে রানি শেবার স্মৃতি-বিজড়িত এক পরিত্যক্ত নগরীতে? সত্যের সন্ধান করতে গিয়ে হেরম্যান ও সুদীপ্ত ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েন, তার পাশাপাশি এই কাহিনিতে ইঙ্গিত মেলে এক কল্পনাতীত বিজ্ঞানের, যার সঙ্গে জড়িত সব কথা আজ তলিয়ে গেছে নিষ্করুণ বালির তলায়।

(৪) অক্টোপাসের লাল মুক্তো: ২০১৫-র শারদীয়া ‘শুকতারা’-য় প্রকাশিত হয় এই উপন্যাসটি। অস্ট্রেলিয়ার উপকূল থেকে বেশ কিছুটা দূরে সমুদ্র থেকে মুক্তো তুলতে গিয়ে ডুবুরিরা মুখোমুখি হয় কিংবদন্তির দৈত্যাকৃতি অক্টোপাসের। এযাবৎ শুধুই গল্পগাছার বিষয়বস্তু এই প্রাণীটিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় সর্বসমক্ষে পেশ করার জন্য হেরম্যান ও সুদীপ্ত রওনা দেন সেই জায়গার দিকে। তারপর কী হয়? ইতিহাস, খুনখারাপি, সমুদ্রতলের রহস্য, এবং সেই রহস্যের আড়ালে থাকা মেঘনাদের সঙ্গে টক্করের এই কাহিনিটি দস্তুরমতো রোমাঞ্চকর।

(৫) আহুল: ২০১৪-র শারদীয় ‘বসুমতী’-তে প্রকাশিত হয় এই কাহিনিটি। ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপমালায় আতঙ্কের সঙ্গে উচ্চারিত হয় যে আহুল-এর নাম, সে কি আসলে একটি প্রকাণ্ড বাদুড়? না কি, বিবর্তনের পরিহাসে টিঁকে যাওয়া ভয়ঙ্কর কোনো প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী? না কি, স্রেফ গল্প? এক মৃত ওলন্দাজ ধাতুবিদের ডায়েরিতে লেখা কিছু কথা আর পথনির্দেশের ভিত্তিতে, আগ্নেয়গিরি আর সমুদ্রে ঘেরা সেই দুর্গম এবং সভ্য মানুষের পদচিহ্ন থেকে নিষ্কলঙ্ক জঙ্গলে অভিযান চালান হেরম্যান ও সুদীপ্ত। তারপর কী হয়? এই জুটির শ্রেষ্ঠ অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে ধর্তব্য এই কাহিনিটিকে আক্ষরিক অর্থে আনপুটডাউনেবল বলাই চলে।

দ্বিতীয় খণ্ডে যেসব উপন্যাস আছে তারা হল: -

(১) বরফ দেশের ছায়ামানুষ: ২০১৩-র পূজাবার্ষিকী ‘আনন্দমেলা’-য় প্রকাশিত এই অ্যাডভেঞ্চারেই হেরম্যান আর সুদীপ্তর প্রথম আলাপ। বন্ধুদের সঙ্গে নেপাল হিমালয়ে এসে পেছনে থেকে যাওয়া সুদীপ্ত যখন কৌতূহলের বশে একটি মনাস্ট্রিতে যায়, তখন সে বুদ্ধের মূর্তির কোলে একটি বিশাল খুলি দেখতে পায়। সেখানে আসা হেরম্যানের সঙ্গে তার আলাপের পর ঠিক হয় যে এই খুলিটা আদতে যে দুর্গম ও অত্যন্ত রহস্যময় গুম্ফায় রাখা থাকে, সেই মিগু গুম্ফায় গিয়ে তাঁরা জানার চেষ্টা করবেন, ইয়েতির কোনো অস্তিত্ব সেখানে ছিল, বা আছে কি না। তারপর তারা জড়িয়ে পড়ে এক জটিল রহস্যে, যার ভাঁজে-ভাঁজে লুকিয়ে আছে রোমাঞ্চ, বিশ্বাসঘাতকতা, বিজ্ঞান, আর ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ এক রহস্য।

হ্যাঁ, দায়িত্ব নিয়েই বলছি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর “পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক” বা শেখর বসু-র “ইয়েতির মুখোমুখি”-কে তথ্যে, তত্ত্বে, গতিতে, এবং প্লটে টেক্কা দিয়েছে এই উপন্যাসটি। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘ইয়েতি অভিযান’ দেখে যদি রেগে কাঁই হয়ে থাকেন, তাহলে তার আদর্শ অ্যান্টিডোট এই উপন্যাসটি পড়া।

(২) কোস্টারিকার রক্তচোষা: ২০১৬-র শারদীয়া ‘শুকতারা’-য় প্রকাশিত হয় এই উপন্যাসটি। মধ্য আমেরিকার কুয়াশামাখা বন-পাহাড়ে শুরু হল রক্তচোষা কোনো প্রাণীর উপদ্রব। এই কি সেই কিংবদন্তির ‘চুপকাবরা’, যার হত্যালীলার কথা শোনা গেছে মেক্সিকো, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস, এবং কোস্টারিকায়? সত্যানুসন্ধানে নামলেন হেরম্যান ও সুদীপ্ত। ঘটনাস্থলে তাঁদের আলাপ হল বেশ কিছু রহস্যময় মানুষের সঙ্গে, যাঁদের একজন আবার ইউ.এফ.ও বিশেষজ্ঞ, যাঁর মত চুপকাবরা আসলে অন্য গ্রহের প্রাণী। সত্যিটা কি জানা যাবে? সাঙ্ঘাতিক বিপদের মধ্যেও ধরা যাবে কি চুপকাবরা-কে?

মধ্য আমেরিকার এই দেশগুলো বাংলা সাহিত্যে অনালোচিত, তাই রহস্যরোমাঞ্চ সংক্রান্ত বিনোদনের পাশাপাশি পাঠককে এক নতুন দেশ ঘুরিয়ে আনার, এবং সেখানকার পরিবেশ ও ইতিহাস সংক্রান্ত নানা তথ্য দেওয়ার জন্যও কৃতিত্ব পাবেন লেখক।

(৩) বিছে মানুষের দাঁড়া: ২০১৬-র ‘মায়াকানন’ বার্ষিকীতে প্রকাশিত হয় এই উপন্যাসটি। হেরম্যান আর সুদীপ্ত-র এবারের অ্যাডভেঞ্চার ছিল আরবের কুখ্যাত ‘রাব-অল-খালি’ মরুভূমিতে, কিংবদন্তির দানব বিছে ইউরিপটেরাস-এর সন্ধানে। প্রথম প্রকাশের সময়েই উপন্যাসটির অনন্য পটভূমি-নির্মাণ, মরুভূমির বুকে একটি হারিয়ে যাওয়া শহর সন্ধানের রোমাঞ্চ, মাটির নিচে বিছে-মানুষদের সঙ্গে লড়াই, শেষে দানব বিছের সঙ্গে মোলাকাতের বর্ণনা, এসব তুচ্ছ করে অন্য কয়েকটি জিনিস আলোচ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই উপন্যাসে লেখক লাভক্র্যাফটের থুলু মিথোজ (Cthulhu Mythos)-এ বর্ণিত উন্মাদ আরব আল-হাজরেদ ও তার লেখা নেক্রোনমিকন নিয়ে অনেক কথা বলেছেন, এবং উপন্যাসে তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্লট ডিভাইস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ‘মায়াকানন’-এ প্রকাশের সময়েই জানা গেছিল যে এই রেফারেন্সগুলো প্রায় সবই ভুলে ভরা ছিল। দেখে খারাপ লাগল যে গ্রন্থাকারে ‘সমগ্র’-তে ঠাঁই পাওয়ার সময় লেখক সেই ভুলগুলোর কোনো সংশোধন করার চেষ্টাই করেননি। তার ওপর ছাপাখানার ভূতের নৃত্যে উপন্যাসটায় বিভিন্ন নাম কার্যত প্রত্যেক পাতায় আলাদা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ের অন্যতম অগ্রগণ্য শিশু-কিশোর সাহিত্যিক তাঁর পাঠকদের কাছে লেখা পেশ করার সময় এতটা অবহেলা দেখিয়েছেন দেখে খুবই খারাপ লাগল। আশা রাখি যে লেখকের শুভানিধ্যায়ীরা তাঁকে এটা বোঝাতে সক্ষম হবেন যে, পাঠকদের এইভাবে টেকন-ফর-গ্র্যান্টেড করে নিলে তার ছাপ অন্য লেখায়, এবং বইয়ের বিক্রিবাট্টায় পড়তে বাধ্য।

(৪) চাদের বাজনা: ২০১৪-র ‘আমপাতা জামপাতা’ বার্ষিকীতে প্রকাশিত এই উপন্যাসেই শুরু হয় জুয়ান ও দীপাঞ্জনের নিজস্ব অ্যাডভেঞ্চার তথা রহস্যভেদ। আফ্রিকার এক ছোট্ট দেশ চাদ-এ ইউনেস্কোর টিমের সদস্য হয়ে গিয়ে সেখানকার নানা ধরনের বাজনা কিনতে আগ্রহী এক ব্যবসায়ী শ্যাঁপলিও-র সঙ্গে তাঁরাও রওনা হন দেশের গভীরে। সেখানে নানা ধরনের বিপদ, বিশ্বাসঘাতকতা, এবং নিশ্চিত মৃত্যু সামলে কীভাবে তাঁরা নিষিদ্ধ ‘ফুলানি ট্যাম ট্যাম’ ঢাকের পাশাপাশি কিছু শিশুকে চাইল্ড আর্মি-র সদস্য হয়ে মৃত্যুবরণ করার থেকে বাঁচালেন, সেই রোমাঞ্চকর গল্পই ধরা পড়েছে এই উপন্যাসে। সহজ ভাষায়, নিটোল গল্প বলায়, এবং শক্তিশালী একটি বার্তা দেওয়ায় এই গল্প পাঠকের কাছে সার্থক বলেই প্রতিপন্ন হবে।

(৫) শেরউড বনের শিঙা: ২০১৫-র ‘আমপাতা জামপাতা’ বার্ষিকীতে প্রকাশিত হয় এই উপন্যাসটি। একটি সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জুয়ান ও দীপাঞ্জন মূলত কৌতূহলের বশে নটিংহ্যামের এক অতি প্রাচীন প্রাসাদের অতিথি হন, যেখানে টাওয়ার অফ লন্ডন-এ ছাড়ার জন্য র‍্যাভেন বা দাঁড়কাক লালন করা হয়। তারপর, সেই প্রাসাদে ঘটতে থাকা রহস্যময় ঘটনাবলির মর্মোদ্ধার করা, এবং অমূল্য এক সম্পদ যাতে বেহাত না হয় তা নিশ্চিত করা, এই লক্ষ্যে তাঁদের প্রয়াস নিয়েই এই উপন্যাস। তবে হ্যাঁ, প্রথম প্রকাশের সময় এই লেখাগুলোর সঙ্গে অনুপ রায়-এর চমৎকার অলঙ্করণ লেখাগুলোতে এক আলাদা মাত্রা যোগ করেছিল, যা এই বইয়ে পাওয়া গেল না।

এই দুটি বই থেকে দুটো কথা মনে হয়, আর তারা হল: -

১] বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে রহস্য-রোমাঞ্চ মিশ্রিত অভিযানের কাহিনি, যাকে সোজা কথায় অ্যাডভেঞ্চার বলা হয়, লেখার ক্ষেত্রে হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত এই মুহূর্তে অত্যন্ত বিশিষ্ট, এবং কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আছেন। তবে এই ধরনের কাহিনি লিখতে যে বিপুল পরিমাণ অধ্যয়ন প্রয়োজন, তা যদি চালিয়ে না যাওয়া যায়, তাহলে তাঁর লেখা গল্পও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর শেষ দিকের সন্তু-কাকাবাবু কাহিনির মতো হাস্যকর হয়ে উঠবে।

২] ‘সমগ্র’ আকারে প্রকাশের সময় লেখাগুলোর পরিমার্জনা, প্রুফ-চেকিং, এবং প্রথম প্রকাশকালীন তথ্য যদি দেওয়া না হয়, তাহলে সেটা পাঠকের সঙ্গে প্রকারান্তরে তঞ্চকতা করা হবে, কারণ এই লেখাগুলো অধিকাংশ পাঠকের দ্বারা পূজাবার্ষিকী বা শারদীয়া-র পাতাতেই পঠিত, এবং বই আকারে কেনার সময় অন্তত ওই পরিমাণ ভ্যালু-অ্যাডিশন পাঠকের প্রাপ্য।

আবার ফিরে আসব নতুন বইয়ের খবর নিয়ে। ততদিন অবধি, আসি তাহলে।

 


লেখক পরিচিতি: এক উদ্যমী পাঠক, যিনি বিপ্লব, চোখের জল, মানবচরিত্রের অতলস্পর্শী গভীরতা, সিন্ডিকেট, সারদা, ধোনি, ইত্যাদি তাবড় বিষয় থেকে দূরে, স্রেফ বেঁচে থাকার গল্প পড়তে চান। নিজের ভালবাসা থেকেই দীর্ঘদিন বইয়ের রিভিউ করছেন।                   

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.