প্রথম পাতা

বিনোদন

খবর

আইন/প্রশাসন

বিজ্ঞান/প্রযুক্তি

শিল্প/সাহিত্য

সমাজ/সংস্কৃতি

স্বাস্থ্য

নারী

পরিবেশ

অবসর

 

বইয়ের খবর

মার্চ ১, ২০১৭

 

তেঁতুলপাতার গল্প

ঋজু গাঙ্গুলি


কতটা ছোটো হলে, আর কতটা ‘গল্প’ থাকলে  কিছু শব্দ, বাক্য, আর যতিচিহ্ন ছোটোগল্প হয়?
প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু উত্তর কি জানা?

তথাকথিত বাণিজ্যিক পত্রিকা, সাহিত্যপত্র, সাময়িকী ইত্যাদিতে নিয়মিত গল্প প্রকাশিত হয়। তাতে তথাকথিত ‘গোল’ গল্পের পাশাপাশি ফর্ম, কন্টেন্ট, ভাষা, প্রকাশভঙ্গী ইত্যাদি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলে। কিন্তু এই ‘মূল’ধারার পাশাপাশি বয়ে চলা যে ঈষৎ উন্নাসিক, ঘোষিত ভাবে আদর্শবাদী এবং সচেতনভাবে ব্যতিক্রমী পত্রিকাগুলোকে আমরা ‘লিটল ম্যাগাজিন’ বলে থাকি, তাতে কিন্তু উপরোক্ত প্রশ্নদুটোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলে আরো বেশি করে। তার কারণ মূলত স্থানাভাব, যার তাড়নায় শক্তিশালী গদ্যশিল্পী থেকে ওপরচালাক কলমবাজ, সবাইকেই ‘শব্দসীমা’ নামক বীজমন্ত্রটি জপে যেতে হয় সৃজণকালে।

কিন্তু এই ‘অন্যরকম’ পত্রিকায় প্রকাশের পর সেই গল্পেরা হারিয়ে যায়, এটাও সত্যি। আর সেজন্যেই, নবীন ও উদীয়মান লেখকদের পরম বন্ধু ‘সৃষ্টিসুখ’ প্রকাশনার তরফে এই বইমেলায় পাঠকদের জন্য কিছুটা অপ্রত্যাশিত উপহার হয়ে এল একটি ৯৯ টাকা দামের, মাত্র ৮০ পাতার, ডাইজেস্ট সাইজের সামান্য কিছু টাইপোয় লাঞ্ছিত, কিঞ্চিৎ পুরোনো বানানরীতিতে সাজানো পেপারব্যাক, যার নাম: “তেঁতুলপাতার গল্প”।
এই শীর্ণকায় বইটির বিশেষত্ব দুটি। প্রথমত, এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গদ্যশিল্পী সৈকত মুখোপাধ্যায়ের লেখা, প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য মাত্র দ্বিতীয় গল্প-সংকলন এটি। দ্বিতীয়ত, এই বইয়ে স্থান পেয়েছে এমন বারোটি গল্প যাদের প্রতিটিই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল লিটল ম্যাগাজিনে, এবং এই বইটিতে সংকলিত না হলে সুজন পাঠক এদের হদিশই পেতেন না।

একজন লেখকের সাহিত্যসৃজণকালকে যদি কোনো নক্ষত্রের জীবদ্দশার সঙ্গে তুলনা করা যায়, তাহলে এই গল্পগুলো যেসময় রচিত হয়েছে তা সৈকত মুখোপাধ্যায়ের নীলাভ-শ্বেত পর্যায়ের সঙ্গে তুলনীয়, যখন ভাষা আর উপমার প্রবল দ্যূতি লেখাগুলোর প্রাণস্বরূপ ‘গল্প’-র বিনাশ ঘটাতেই পারত। কিন্তু এখানেই লেখকের সার্থকতা যে তাঁর এই নিতান্তই ছোটো লেখাগুলো, যাদের নিয়ে উপক্রমনিকা ‘তিন্তিড়ি সমাচার’ লিখতে গিয়েও তিনি টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের উপমাই দিয়েছেন, ক্ষুদ্র আয়তন, ভাষার তেজ, চিরচেনা ন্যারেটিভ কাঠামোয় জাদুবাস্তবতার আমেজ নিয়েও, গল্প হয়েছে।

রোহণ কুদ্দুসের করা মাথামুণ্ডুহীন প্রচ্ছদটির ধাক্কা সামলে বইটির পাতা ওল্টালে যে গল্পগুলো পাই, সেগুলো নিয়ে আলোচনাটা সূচিপত্রের বদলে প্রকাশকাল অনুযায়ী সাজালাম।

১. “দ্বিরাগমন”: ‘জলপ্রপাত সাহিত্য’ পত্রিকায় সেপ্টেম্বর ২০০৭-এ প্রকাশিত এই গল্পটিই এই সংকলনের সবচেয়ে পুরোনো গল্প। প্রেম, শরীর, ক্ষয়, মৃত্যু, এসবই এক আশ্চর্য হলুদ আলোয় ধরা পড়েছে এই গল্পে।
২. “খাঁচা”: ‘ঐহিক’ পত্রিকায় ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ প্রকাশিত হয় এই বাস্তব আর কল্পনা, অতীত আর বর্তমান, জীববিদ্যার পুঁথিগত জ্ঞান আর কঠিন-কঠোর সমকাল মিলেমিশে একাকার করা গল্পটি।
৩. “তার রাত্রি পিতার রাত্রি”: সংকলনের একেবারে প্রথমেই স্থান পাওয়া এই গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘গিনিপিগ’ পত্রিকায় জুলাই ২০০৮-এ। ছোটোবেলা থেকে গলির মোড়ে বা পার্কের সামনে দাঁড়ানো যে প্রায়-বিমূর্ত স্থাপত্য আমাদের চোখে পড়েও পিছলে যায়, তার অসহায় অস্তিত্ব আর আমাদের চৈতন্য আচ্ছন্ন করে রাখা এক দারুমূর্তি একাকার হয়ে যায় এই জাদুবাস্তব হয়েও অতিবাস্তব গল্পে।
৪. “হ্যামলিনের হারানো শিশুরা”: জানুয়ারি ২০০৯-এর ‘রবিবার’-এ প্রকাশিত হয় এই গল্পটি। এই দহনযন্ত্রণার বীজবাহী লেলিহান গল্পটিকে নিয়ে এক-দু’কথায় কিছু লেখা অসম্ভব, তাই সেই চেষ্টা করলামনা।
৫. “স্পর্শদোষ”: ‘গিনিপিগ’ পত্রিকার জানুয়ারি ২০০৯ সংখ্যার মাধ্যমে এই গল্পটি পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। সুখশয্যায় শায়ীন পাঠকের কাছে এই গল্প কেমন লেগেছিল জানিনা, আমি তো চারপাশের হাজার শব্দ আর আলোর মধ্যেও কঙ্কাল পুরোহিতের পাশাখেলার আওয়াজ পেলাম!
৬. “অর্ণার নামে চিঠি”: ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এর ‘ঐহিক’-এ প্রকাশিত হয় এই অলৌকিক, অপার্থিব,  অনন্তস্পর্শাভিলাষী প্রেমের গল্পটি। সর্বাঙ্গে চিঠি, ডাকবাক্স, লাল খাম, আর সর্টারের সত্বা জড়িয়ে রাখা এই গল্পটাকে আমি যদি একটু বেশি ভালোবাসি, তাহলে নিশ্চই আপনারা কিছু মনে করবেননা।
৭. “লেডিস সাইকেল”: ‘অল্প কথায় গল্প’ পত্রিকায় এপ্রিল ২০০৯-এ প্রকাশিত হয়েছিল এই ‘ছোটো’ শব্দের পরীক্ষা নেওয়া গল্পটি। সাকুল্যে শ’তিনেক শব্দে কীভাবে না-বলা-কথার মধ্য দিয়ে গল্প বলতে হয় তা যদি শিখতে চান, তবে এটিকে মডেল করুন।
৮. “মায়াচিঠি”: জুলাই ২০০৯-এর ‘গিনিপিগ’-এ প্রকাশিত এই গল্পটা পড়ে বুকে ধাক্কা লাগে, চমকে উঠতে হয় এই ভেবে যে নরম কিংখাবে লুকোনো তরবারির মতো করেই কি এই গল্পে অতুলনীয় ভাষার আড়ালে অপেক্ষা করছে নিয়তি, বা মৃত্যু?
৯. “স্বপ্নক্ষতদুষ্ট”: সেপ্টেম্বর ২০০৯-এর ‘মহাযান’-এ প্রকাশিত এই অতিসংক্ষিপ্ত গল্প পড়লে শুধু ভাষায় নয়, নিষ্পাপ কৈশোরের চাদরে ঢাকা প্রথম প্রেমের টানে নয়, বরং চরিত্রের অনিবার্য পরিণতি দেখে নীলকন্ঠ হতে হয় পাঠককে।
১০. “বর্ণচোর”: অক্টোবর ২০০৯-এ ‘গল্পের কাগজ এখন’-এ প্রকাশিত এই গল্পটি পড়ে যদি আপনার চোখ একটুও ঝাপসা না হয়, যদি মনের ধূসর লূতাতন্তুনিবিড় কোণও হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে স্বর্ণিল না হয়ে ওঠে, তাহলে আপনি নেহাৎ পাষাণহৃদয়!
১১. “অন্ধজাতক”: জানুয়ারি ২০১০-এ ‘রবিবার’-এ প্রকাশিত হয় এই গল্পটি। ভাষায়, চিত্ররূপকল্পে, পরাবাস্তবতার ঐশ্বর্যে পাঠককে স্তব্ধবাক করে দেওয়া এই গল্পটি পড়ার অনেক-অনেক পরেও আপনার সঙ্গে থেকে যেতে বাধ্য।
১২. “ইয়ামন”: ‘পরিকথা’ পত্রিকায় জানুয়ারি ২০১০-এ আত্মপ্রকাশ করা, মৃত্যুচেতনার নীল রঙ আর এক ঘাতকের নৈর্ব্যক্তিক নিষ্ঠুরতায় শীতল, আপাদমস্তক শিহরণ-জাগানিয়া এই গল্পটিই আলোচ্য সংকলনের তেঁতুলপাতায় ঠাঁই পাওয়া শেষজনা।

এই গল্পগুলোয় সমাজ আছে, আছে সমকাল। কিন্তু এদের মূল সম্পদ হল মানবচরিত্রের অমোঘ, অপরিমেয় রহস্যময়তা, যা বাস্তব-অবাস্তব-জাদুবাস্তব মেশানো ভাষায় ও চিত্রকল্পে, শোভন অথচ নির্মোহ ভাষায় পরিবেশন করেছেন লেখক।

সব গল্প পড়ে মুগ্ধ হতে পারিনা। সব গল্প পড়ে মনে হয়না যে স্বাতী নক্ষত্র থেকে ঝরে পড়া অশ্রুবিন্দু নীথর হয়ে গড়ে তুলেছে এই কালোত্তীর্ণ মুক্তোদের।

কিন্তু...,

কতটা ছোটো হলে শব্দ-বাক্য-যতিচিহ্ন দিয়ে গড়া একটি গদ্য মর্মভেদী হয়ে অবিস্মরণীয় কিছু গল্প বলতে পারে তা যদি জানতে চান...,

যদি চান শক্তির শীর্ষে অধিষ্ঠিত এক লেখকের সাহিত্যপ্রতিমা নির্মাণের প্রথম দিনগুলোর অন্তরঙ্গ দিনলিপির সঙ্গে পরিচিত হতে...,

তাহলে হাতে তুলে নিন এই “তেঁতুলপাতার গল্প”।


আলোচক পরিচিতি - আলোচক এক উদ্যমী পাঠক, যিনি বিপ্লব, চোখের জল, মানবচরিত্রের অতলস্পর্শী গভীরতা, সিন্ডিকেট, সারদা, ধোনি, ইত্যাদি তাবড় বিষয় থেকে দূরে, স্রেফ বেঁচে থাকার গল্প পড়তে চান। নিজের ভালবাসা থেকেই দীর্ঘদিন বইয়ের রিভিউ করছেন।

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2015 Abasar.net. All rights reserved.



অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।