অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


বইয়ের আলোচনা

মে ১৫, ২০১৭

 

সাম্ভালা ট্রিলজি

ঋজু গাঙ্গুলী

সাহিত্যে ফ্যান্টাসি মানে কী?

অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি জানাচ্ছে, ফ্যান্টাসি হল “এ জঁর অফ ইমাজিনেটিভ ফিকশন ইনভলভিং ম্যাজিক অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার, এস্পেশালি ইন আ সেটিং আদার দ্যান দ্য রিয়্যাল ওয়ার্ল্ড”। সমার্থক শব্দ হিসেবে মিথ, লিজেন্ড, ফেবল, ফেয়ারি টেল ও রোমান্স-ও উল্লিখিত হয়েছে ওই মহাগ্রন্থে। স্বাভাবিক ভাবেই, বাংলায় অ্যাদ্দিন এই ঘরানার নজির হিসেবে আমাদের সামনে ঠাকুরমার ঝুলি আর বিক্রম-বেতাল বা বত্রিশ সিংহাসন টাইপের গল্পগাথা তুলে ধরাটাই দস্তুর ছিল। কিন্তু ইংরেজি ভাষায় ফ্যান্টাসি কল্পবিজ্ঞান ও হরর, এই দুই জঁরের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে রূপকথা বা উপকথার গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে আসে প্রথমে হাওয়ার্ডের পাল্পে, আর তারপর টোকিয়েনের অতুলনীয় লর্ড অফ দ্য রিংস-এ। এই লেখাগুলোয় প্রটাগনিস্টের লড়াইয়ে মিশে যায় অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর, খারাপের বিরুদ্ধে ভালোর সংগ্রাম, যার মধ্যে আমরা খুঁজে পাই সমকালের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত নানা লড়াইয়ের প্রতিধ্বনি। বাংলায় কেন এমন লেখা হয়নি?

এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে গত এক শতাব্দীর ইতিহাসে, যেখানে বাঙালির ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য তথা জীবনধারণের স্বাধীনতা বারংবার বিপন্ন হয়েছে রাজনীতি আর ধর্মের আক্রমণে, যার ফলে আমাদের সাহিত্য যতটা অন্তর্মুখী হয়েছে, ততটা বহির্মুখী হয়নি। তাই আজও আমরা অ্যাডভেঞ্চারের মাধ্যমে আশেপাশের চিরচেনা পৃথিবী ছাড়িয়ে অন্য কোনোখানে যাওয়ার আখ্যান খুব কমই পাই। আর সেই আখ্যানে অলৌকিক বা অবিশ্বাস্য ঘটনাক্রমের মিশেল পাই আরো কম, যার শেষ সার্থক উদাহরণ হিসেবে সত্যিজিৎ রায়ের প্রফেসর শঙ্কুর কাহিনিগুলোকে তুলে ধরা যেতে পারে।

না, ভুল বললাম। যেতে পারত। কারণ আজকের পাঠকের কাছে এসে গেছে বাংলায় লেখা প্রথম সার্থক ফ্যান্টাসি, যেখানে ঘটনাবলির প্রেক্ষাপট হিসেবে গোটা পৃথিবী তথা মানবজাতির ইতিহাস থাকলেও যার সারা গায়ে লেগে আছে সমকালের সুবাতাস। আসুন, আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই শরীফুল হাসান-এর লেখা “সাম্ভালা” ট্রিলজির।

বাংলাদেশের বিখ্যাত ‘বাতিঘর’ প্রকাশনী থেকে এই ট্রিলজি-র প্রথম খণ্ডটি প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি ২০১২-য়। সিরাজুল ইসলাম নিউটন-এর প্রচ্ছদে শোভিত এই ২৫৫ পাতার হার্ডকভারটি প্রকাশের সঙ্গে-সঙ্গেই যে ওপার বাংলায় আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কাঁটাতার পেরিয়ে আসা জামাতি বা হেফাজতিরা এপারে সমাদৃত হলেও বইপত্রের ব্যাপারে সরকার ও বুদ্ধিজীবীরা যে উদাসীন তা আমরা সবাই জানি। সেজন্যই বইটি ভারতে এখনও অবধি খুব কম সংখ্যক পাঠকের হাতে পৌঁছেছে, যা সত্যিই ট্র্যাজিক।

কী ছিল এই বইয়ে? এই বইয়ে পাশাপাশি বেশ কয়েকটা গল্পের সুতো বিছিয়েছিলেন লেখক। কাহিনির কেন্দ্রে আছে একজন, যাকে পাঠক আবদুল মজিদ ব্যাপারী বলেই চেনে। সেই বৃদ্ধ এবং আপাতদৃষ্টিতে অথর্ব মানুষটির মধ্যে কিন্তু এমন একটা রহস্য আছে, যাতে নাক-গলাতে গিয়ে হারিয়ে যায় দু’জন মানুষ। তার স্মৃতির হাত ধরে আমরা পিছিয়ে যাই অনেক-অনেক বছর, আর কিছুটা হলেও বুঝতে পারি, কে এই মানুষটি, আর কী খুঁজছেন তিনি। তার নাতি রাশেদ ঢাকায় পড়াশোনা করতে এসে অনিচ্ছাসত্বেও জড়িয়ে পড়ে তার বন্ধু শামীমের প্রথমে নিখোঁজ হওয়া এবং পরে অপমৃত্যুর ব্যাপারে। রাশেদ জানতে পারে, শামীম যে গোপন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল, সেই সংগঠনের নেতার কাছ থেকে সে একটা বই সরিয়েছে।

কিন্তু কী এমন আছে সেই বইয়ে? প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য বাংলাদেশে এসেছেন ডক্টর কারসন, নাকি তাঁর আসল উদ্দেশ্য অন্য কিছু, বা অন্য কাউকে খুঁজে বের করা? প্রাচীন ভাষার পাঠোদ্ধার করতে পারেন বলেই কি তিনি অপহৃত হলেন?
লুসিফারের উপাসকের দলে এমন কেউ কি আছে, যার মধ্যেও রয়েছে ব্যাখ্যাতীত কোনো শক্তি, আর ইতিহাস?
ঘটনার ঘনঘটার পাশাপাশি ইতিহাসের নদী বেয়ে মন্থর চলন এই কাহিনিতে এমন ভাবে মিশে যায় যে পাঠকের এক বারের জন্যও লেখা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। আর এইভাবেই একটা সময় মনে হয়, যেন দুষ্টের দমন হল, শিষ্টের পালন না হলেও একটা সমাপ্তি হল। কিন্তু ‘পিকচার অভি বাকি হ্যায়, মেরে দোস্ত’! আবদুল মজিদ ব্যাপারীর জীবনের যে ঝলকটুকু পাঠক দেখতে পান তাতে এটা স্পষ্ট হয় যে গল্প শেষ হয়নি।

ফেব্রুয়ারি ২০১৩-য় ডিলানের প্রচ্ছদে রঙিন হয়ে আত্মপ্রকাশ করে “সাম্ভালা: দ্বিতীয় যাত্রা” নামক ২৫৬ পাতার হার্ডকভারটি। এই বইয়েও সমান্তরাল ভাবে বয়ে চলে একাধিক কাহিনির স্রোত। আবদুল মজিদ ব্যাপারী, যে এখন পরিস্থিতির চাপে লাখানিয়া সিং নামে পরিচিত, এবার সব দ্বিধা কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ে সাম্ভালার সন্ধানে। ডক্টর কারসন দিল্লি এসে পৌঁছন, এবং গত কাহিনিতে যে অধ্যাপকটির সঙ্গে তাঁর একটা পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল সেই ডক্টর আরেফিন, ও আরো দু’জন ভারতীয় গবেষককে ডেকে নিয়ে দল তৈরি করেন, সাম্ভালা খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে। অ্যান্টিকের এক চোরাকারবারি সেই দলের পিছু নেয়।

সেই সঙ্গে এই কাহিনিতে ফিরে আসে প্রথম খণ্ডে প্রায় অনাদৃত ও উপেক্ষিত এক রহস্যময় চরিত্র, যার অন্তরের বীভৎস ভাব, এবং অকল্পনীয় শক্তির প্রকাশ ঘটতে থাকে এবার। সে সাম্ভালা খুঁজছে না, সে খুঁজছে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বীকে।
ইতিমধ্যে, বেড়াতে গিয়ে এক প্রাণঘাতী অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়ে রাশেদ, যার শেষে তার জন্য অপেক্ষমান অতুল ঐশ্বর্য, বা চরম যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু।

প্রথম খণ্ডের তুলনায় এই খণ্ডে চরিত্রগুলো আরো স্পষ্ট ভাবে ফুটে ওঠে। তাদের মধ্যেকার সাদাকালো শেডগুলো যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনই নানা আপাত-অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়েও লেখক তাঁর মতো করে আমাদের বুঝিয়ে দিতে থাকেন, “মানুষেরি মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেতে সুরাসুর”। এবং এই খণ্ড যেখানে শেষ হয় তেমন অবস্থাকে বোঝানোর জন্যই বোধহয় ইংরেজিতে ‘ক্লিফহ্যাঙ্গার’ বিশেষণটি ব্যবহৃত হয়। পাঠকেরা যে লেখকের মাথায় বন্দুক ধরে তাঁকে দিয়ে পরের খণ্ডটা তদ্দণ্ডে লিখিয়ে নেননি, এটাই আশ্চর্যজনক।

ফেব্রুয়ারি ২০১৪-য়, এবারো ডিলানের অনবদ্য প্রচ্ছদে শোভিত হয়ে, প্রকাশিত হয় এই ট্রিলজির শেষ খণ্ড তথা ৩০৪ পাতার হার্ডকভার বইটি। এবার সবক’টি প্রধান চরিত্র একে-একে এসে পৌঁছয় ভারত-নেপাল পেরিয়ে তিব্বতে, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে পদে-পদে বিপদ। এরই মধ্যে আমরা ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে ব্যাপারী, ওরফে লাখানিয়া সিং, এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী তথা মহাশত্রু মিচনারের সম্বন্ধে বিস্তৃত ভাবে জানতে পারি। অ্যাকশন, হিংস্রতা, রক্তপাত, অবিশ্বাস, সন্দেহ, রাজনীতি, ধর্ম, এবং ভয়ের ঘনায়মান আবহের মধ্যেও ঘটনার স্রোত আমাদের থামতে দেয় না।

যতক্ষণ না সব রণ-রক্ত-সফলতা পেরিয়ে আমরা ফিরে আসি সেই জীবনে, যেখানে ভালো থাকা আর ভালো রাখাই সবচেয়ে বড়ো কথা। আমরা বুঝতে পারি, একজন মানুষের অন্তিম আকাঙ্ক্ষা কখনোই সাম্ভালা বা সাংগ্রিলা নয়, সম্রাট অশোকের সেই ন’জন পারিষদের কাছে সুরক্ষিত গুপ্তজ্ঞানের ভাণ্ডার নয়, এমনকি অমরত্বও নয়। বরং তুমুল অ্যাডভেঞ্চারের পরেও ঘরে অপেক্ষা করে থাকা মানুষটির চোখের কোণে জমে ওঠা জলের বিন্দুটি সযত্নে মুছিয়ে দেওয়াতেই পাওয়া যায় সেই সার্থকতা, যার কথা ভেবে লালন গেয়েছেন, “এমন মানব জনম আর কি হবে?”

বাতিঘর প্রকাশনার যা বৈশিষ্ট্য সেই ছাপার ভুলের প্রাদুর্ভাব খুব একটা না দেখলেও বানানের ব্যাপারে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই হচ্ছে। লেখকের গদ্য খুব একটা সুখপাঠ্য নয়, তবে প্রথম খণ্ডের আড়ষ্টতা একটু-একটু করে কাটিয়ে পরের দিকের লেখায় ব্যাপ্তি আর গভীরতা দুয়েরই বৃদ্ধি ঘটেছে, যা লেখাটার মান বাড়িয়েছে। সব থেকে বড়ো কথা, এই সম্পূর্ণ মৌলিক কাহিনিটি কোনো মতেই বিদেশি সাহিত্যের অনুকরণ নয়, বরং উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির শান্ত ও বৌদ্ধিক ভাবটির মাটিতেই ডালপালা মেলেছে এটি। এবং শুধু এই একটি কারণেই লেখক আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। সঙ্গে একটা আনপুটডাউনেবল থ্রিলার পড়তে পাওয়া গেছে, এটা পুরোপুরি বোনাস।

যত তাড়াতাড়ি পারেন, বই তিনটে জোগাড় করুন, ও পড়ে ফেলুন প্লিজ।


লেখক পরিচিতি: এক উদ্যমী পাঠক, যিনি বিপ্লব, চোখের জল, মানবচরিত্রের অতলস্পর্শী গভীরতা, সিন্ডিকেট, সারদা, ধোনি, ইত্যাদি তাবড় বিষয় থেকে দূরে, স্রেফ বেঁচে থাকার গল্প পড়তে চান। নিজের ভালবাসা থেকেই দীর্ঘদিন বইয়ের রিভিউ করছেন।                   

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.