অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


বিবিধ প্রসঙ্গ

মে ৩০, ২০১৭

 

প্রবাল কথা

সৌরভ ঘোষাল

পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬০০ মিটার বা ২০০ ফিট নিচে এক আশ্চর্য সামুদ্রিক পরিবেশে বিরাজ করে কিছু অমেরুদণ্ডী প্রাণী আমরা তাদের চিনি কোরাল বা প্রবাল নামে। মজার ব্যাপার, বিশ্বে যখন মানুষে-মানুষে দ্বন্দ্ব, মারামারি, হিংসা...তখন বর্ণিল এই প্রাণীগুলো শুধু সারাটা জীবন নয়, মরণের পরও সংঘবদ্ধ হিসেবে বাস করে৷ তবে এখানেই শেষ নয়, মৃত কোরাল'এর দেহ স্তূপাকারে জমা হয়ে নানা আকৃতির কাঠামো তৈরি করে৷ আমরা যাকে বলি ‘কোরাল রিফ' বা প্রবাল দ্বীপ৷ যদিও প্রবাল দ্বীপ এর আকার, গঠন অনেকটাই নির্ভর করে সাগরতলের পরিবেশের উপর, ক্যালসিয়াম কার্বোনেট কাঠামো দ্বারা এই প্রবাল গুলি একসঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন আকারের প্রাচীর তৈরি করে। অনেক পরিবেশবিদ প্রবাল-প্রাচীর গুলিকে “rain forest of the sea” বলে উল্লেখ করেছেন।



ছবি সুত্র; ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন।

উষ্ণমণ্ডলীও/ক্রান্তীয় প্রবাল-প্রাচীর গুলীর সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চার্লস ডারউইন উল্লেখ করেন “tropical coral reefs as oases in the desert of the ocean”. অর্থাৎ ক্রান্তীয় অঞ্চলের প্রবাল-প্রাচীর গুলি অনেকটা মরুভূমির মরূদ্যানের ন্যায়। ১৮৪২ সালে তিনি তাহিতি দ্বীপ অতিক্রম করার সময় একটি বিশেষ তথ্য উল্লেখ করে লিখেছিলেন “coral… seems to proliferate when ocean waters are warm, poor, clear and agitated” অর্থাৎ প্রবাল প্রচুর সংখ্যায় স্বীয় বংশবৃদ্ধি করে তখনই যখন সমুদ্রের জল স্বচ্ছ, স্থির, ও উষ্ণ অবস্থায় থাকে। তিনি আরও প্রতিফলিত করেন যে ক্রান্তীয় প্রবাল-প্রাচীরগুলি, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় বাস্তুসংস্থানগুলির মধ্যে অন্যতম, পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্র ০.১% জুড়ে আছে। প্রফেসার শুলৎস জানান, ‘‘কোরাল রিফ মৃত কোরালের একটি আকৃতি৷ যা সাধারণত গঠিত হয় ট্রপিক্যাল সাগরে৷ ”সাধারণত ২২ ডিগ্রি থেকে ২৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা কোরাল রিফ গঠনে সবচেয়ে সহায়ক কাড়ন এই তাপমাত্রায় ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন জন্মায়, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন এক ধরনের অতিক্ষুদ্র উদ্ভিদ যা জুপ্ল্যাঙ্কটন নামের এক সূক্ষ্ম প্রাণীর প্রধান খাদ্য, আর কোরাল'এর প্রধান খাদ্যই হচ্ছে এই জুপ্ল্যাঙ্কটন৷ সাগরতলের এই আশ্চর্যপূর্ণ খাদ্যচক্র তৈরি করে এক বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র, যা আজ মানবজাতির অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের ফলে বিলুপ্তির পথে ধাবমান।

প্রবালের অববয়কে (organism) বলা হয় পলিপ (polyps)। সাধারণত তারা নিজেদের উপর নির্ভর করে প্রাচীর বা রীফ তৈরি করে কিন্তু অনেক সময় বিভিন্ন চুনাপাথরের উপর সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে এক একটি কলোনি তৈরি করে, এইভাবে কয়েকশো বছর ধরে তৈরি হতে থাকা কলোনি একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে কোরাল রিফ বা প্রবাল-প্রাচীর গঠন করে। পৃথিবীর কিছু কিছু প্রবাল-প্রাচীর আজ থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর আগে বেড়ে উঠেছে যা এখন ক্রমবর্ধমান। প্রবাল-প্রাচীর সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি নিজেদের কলোনি গোড়ে তোলে কাড়ন সূর্যের আলো প্রবালের জীবন চক্রের প্রধান উপাদান। ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা প্রবাল-প্রাচীর গঠনের অনুকূল অবস্থা, তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রির নিচে নেমে গেলে সেখানে প্রবাল বাঁচতে পারে না। এই কাড়নেই অধিকাংশ প্রবাল-প্রাচীর মোটামুটি ভাবে ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৩০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়।

যখন প্রবালপ্রাচীর উপকূল থেকে কিছুটা দূরে গড়ে ওঠে এবং প্রাচীর ও উপকূল এর মধ্যে একটা গভীর ও অ-প্রশস্ত উপহ্রদ থাকে তখন তাকে বলে প্রতিবন্ধক প্রবাল-প্রাচীর (Barrier Reef), পৃথিবীর বৃহত্তম প্রবাল-প্রাচীরটি অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বেরিয়ার রিফ, প্রায় ১২০০ মাইল অঞ্চল নিয়ে এটি অবস্থান করে আছে। অধ্যাপক এ জি মায়ার (A.G Mayer)-এর মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে বিগত ৩০ হাজার বছর ধরে প্রবাল-প্রাচীর গঠিত হয়ে চলছে। প্রশান্ত মহাসাগরের ওয়েক (Wake) দ্বীপ একটি উল্লেখযোগ্য প্রবাল-প্রাচীর। সমুদ্রবিজ্ঞানী-দের ধারণা, কোরাল-প্রাচীর অন্য কোন সামুদ্রিক পরিবেশের তুলনায় প্রতি একর এলাকায় অধিক প্রজাতি বাসস্থান সুনিশ্চিত করে যার মধ্যে ৪০০০ প্রজাতির মাছ, ৮০০ প্রজাতির জেলিফিশ এবং শতাধিক অন্য প্রজাতি রয়েছে। বিজ্ঞানীরা আরও সন্দেহ যে প্রায় 1 কোটি 8 লক্ষ অজ্ঞাত প্রজাতির প্রাণীর বাস এইসব প্রবাল-প্রাচীরে। এই সব প্রবাল-প্রাচীরের জীব-বৈচিত্র্য ২১ শতকের জন্য নতুন ওষুধ খোঁজার প্রধান বিবেচিত স্থান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ক্যান্সার, বাত, ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ, ভাইরাস এবং অন্যান্য রোগের সম্ভাব্য প্রতিকারের ওষুধের উপাদান এবং অনেক মাদকদ্রব্য বর্তমানে প্রবাল-প্রাচীর বা রিফে বসবাসকারী প্রাণী ও উদ্ভিদের থেকে নেওয়া হচ্ছে। অপরিমিত জৈবিক সম্পদের সংরক্ষণাগার এই প্রবালপ্রাচীরগুলি লক্ষ লক্ষ লোককে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সেবা প্রদান করে। কোরাল-প্রাচীরগুলি ১৯৯৮ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত বছরে ৩৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য ও সেবা প্রদান করে আসছে (Costanza et al., 1997)। যা পৃথিবীর পৃষ্ঠতলের 1% এর কম জায়গা জুড়ে অবস্থিত। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখানো হয় যে লক্ষ লক্ষ লোক ফ্লোরিডা উপকুলে প্রতি বছর প্রবালপ্রাচীর পরিদর্শন করে। এই রিফগুলিতে শুধুমাত্র ৭.৫ বিলিয়ন ডলার এর সম্পদ মূল্য আছে বলে ধরা হয়,(জনস প্রমুখ, 2001)।

জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠর তাপমাত্রার বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক জলে রাসায়নিক যৌগ মিশে যাওয়ার ফলে কোরাল-প্রাচীর আজ ধ্বংসের দোরগোড়ায়। প্রবাল-‘পলিপ’ গুলি খুব সংবেদনশীল হওয়ায়, জলের একটু তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলেই মরে যায়। বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত বেশিরভাগ কার্বন ডাই অক্সাইড যা কিনা মানুষের কর্ম- কাণ্ডের ফলে তৈরি, তার ১/৩ শতাংশ সমুদ্রে দ্রবীভূত হয়। এরফলে সমুদ্রের কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধি পায় এবং সাগরের জল অম্লীয় হয়ে ওঠে, একে মহাসাগরীয় অম্লকরণ বলা হয়। এই অম্লকরণের ফলে প্রবাল-‘পলিপ’ গুলি ক্যালসিয়াম কার্বোনেটকে শোষণ করতে পারে না যা তাদের গঠনকে বজায় রাখে এবং প্রবাল-প্রাচীর তৈরি করতে সাহায্য করে। পরিবেশবিদ গন মনে করেন গত ৮ বছরে বিশ্ব-উষ্ণায়ন ফলে পৃথিবীর ১৬% প্রবাল-প্রাচীর ধ্বংস হয়ে গেছে, যা কোনভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড শুধু পৃথিবীর উপরিভাগের পরিবেশকে ধ্বংস করছে না, সমান ক্ষতি করছে মহাসাগরের তলদেশকেও যার মূল্য দিতে হচ্ছে হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণীকে, মানুষও তার ব্যতিক্রম নয়।

উল্লেখপঞ্জিঃ
১ । দ্যুতিমান ভট্টাচার্য, মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী -- আধুনিক ভূ- জলবিদ্যা ও সমুদ্রবিদ্যা, নবদয় পাবলিকেসন্স, পৃ . ২৯৭- ২৯৮।
২। D. S. LAL- Ocenography. Sharda Pustak Bhawan, p. 210-212
৩। https://en.wikipedia.org/wiki/coral_reef।


লেখক পরিচিতি : পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে (বারাসত) ভূগোল নিয়ে স্নাতকোত্তর পর্বে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.