অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


বিবিধ প্রসঙ্গ

মে ১৫, ২০১৭

 

নিরুদ্দেশ সংবাদ

পুষ্পেন্দু সুন্দর মুখোপাধ্যায়

কালের প্রবাহে অনেক প্রথা, অনেক অভ্যাস, অনেক পরিচিত দৃশ্য হারিয়ে যায়, কিছু কিছু হয় তো ফিরে আসে-- কিছুটা নতুন সাজে, নতুন ভঙ্গীতে। কিছু আবার অতলে হারিয়ে যায়। আমার এ উদ্দেশ্য নয় যে প্রমাণ ক'রা তখন সব জিনিষ বা প্রথাই এখনের তুলনায় উত্কৃষ্ট ছিল বা বেশী লোভনীয় ছিল। কারণ লোভনীয় হওয়া নির্ভর ক'রে প্রবৃত্তি থেকে। এটা ঠিক তখন মানুষের লোভ এখনকার মতন এত প্রবল হয়নি। তবে যাঁরা ব'লেন তখন্কার দ্রব্যমূল্য অনেক কম ছিল তাঁরা একটা ব্যাপার ভুলে যান যে উত্কৃষ্ট চা'ল আট আনায় (অর্থাৎ ৫০ পয়সা) এক সের (অর্থাৎ এক কিলোর চেয়ে সামান্য কম) পাওয়া যে'ত ঠিকই তেমনই পশ্চিম বঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ বেতন ছিল আড়াই হাজার টাকা মাসে। একটি নতুন গাড়ী দশ হাজার টাকায় পাওয়া গেলেও খুব বেশী পরিবারে গাড়ী ছিল না। যেমন ধরা যাক ঘড়ি। আগে সংখ্যায় থাক'ত ঘণ্টার অঙ্কগুলি; তাও আবার ল্যাটিন হরফে-- যেমন I, II, III, IV, V IX, XII ইত্যাদি। একটি বৃত্তাকার ডায়ালে। ঘড়ির কাঁটা থাকত দুটি বা তিনটি, তিনটি বিভিন্ন সাইজের। সব চেয়ে বড় মিনিটের, সব চেয়ে ছোট সেকেণ্ডের। আমরা সময় ব'লতাম সকাল সাতটা দশ, পৌনে বারো, বিকেল পাঁচটা বাজতে বিশ ইত্যাদি। আমার একটি হাত ঘড়ি ছিল-- তার বারোর ঘরটা, কেন জানি না লাল রঙের ছিল। এ ছাড়া সেকেণ্ডের ছোট বৃত্তের পরিধিতে N, E, S, W লেখা ছিল। কিন্তু কোন কম্পাসের কাঁটা ছিল না। আমার বন্ধু কেষ্ট বলেছিল,'ওটা আর কিছু নয়, তুই যদি N লেখাটা উত্তর দিকে নিশানা ক'রে ধরিস, পূর্ব, পশ্চিম জেনে যাবি'। ছিল হাতঘড়ি, বড় গোলাকার ডায়ালে। আর ছিল টেবিলে রাখবার ঘড়ি, এও গোলাকৃতি। এ সবই ছিল বড় কাঁটা দেওয়া এবং ইংরাজী বা ল্যাটিন হরফে সময় নির্দেশ ক'রা। টেবিল ঘড়ির ছিল এলার্ম- যা পূর্বনির্দিষ্ট সময়ে ঘণ্টা বাজাত প্রতিবেশীর ঘুম ভাঙিয়ে।

সব ঘড়িতেই অনেক পরিবর্তন এল সময়ে। ঘড়ির কাঁটা গেল হারিয়ে, তার বদলে এল সংখ্যায় লেখা সময়। আমরা পৌনে বারোটা, রাত্রি সাড়ে দশ ইত্যাদি ভুলে গেলাম, বদলে ব'লতে লাগলাম এগারোটা পঁয়তাল্লিশ, তেইশটা তিরিশ। হাতঘড়ি এল গোল, চৌকো, লম্বা, বেঁটে এবং সাইজ হ'তে লাগল ছোট। স্টীলের বদলে প্লাস্টিক জাতীয় উপাদানে তৈরী হ'তে লা'গল।

বহু বছর ঘুরে আবার ফিরে এসেছে পুরোনো আমলের ঘড়ি সাইজে এবং সময় নির্দেশনায়। ভিতরের যন্ত্রাংশের অবশ্য অনেক পরিবর্তন হ'ল ডিজিটাল ঘড়ির প্রয়োজনে। স্প্রিং আর লাগে না বেশীর ভাগ ঘড়িতে। সাইজেও পুরোনো আমলের ম'তই বড় হ'তে লেগেছে, যদিও ছোট এবং চৌকো ঘড়িও আছে। কিন্তু ফিরে এ'ল না পুরোন দিনের এলার্ম। আর হারিয়ে গেল পকেট ঘড়ি। জামার পকেটে (ভিতরে লুকোন পকেট) একটি সুতো বা সরু দড়ির সাথে থাকত যাতে বা'র ক'রে আনা যায়। কোটের বা জ্যাকেটের বুক পকেটেও, যা অবশই ভিতর দিকে হ'ত, রাখা হ'ত। উপরে থাক'ত দম দেবার হুইল। তারা আর ফেরে নাই।

ধরা যাক গাড়ীর কথা, মোটর কার। আগে সব রকম গাড়ীর গিয়ার থাকত গাড়ীর মেঝেতে আর মাথায় থাকত একটি নব। আমরা বলতাম লাট্টু গিয়ার। কালক্রমে প্রাইভেট গাড়ীতে গিয়ার হয়ে গেল ষ্টিয়ারিংয়ে লাগান। ট্যাক্সি, বাস, লরি ইত্যাদিতে কিন্তু সেই লাট্টু গিয়ার। এখন আবার সেই পুরাতন লাট্টু গিয়ারই ফিরে এসেছে সব গাড়ীতে। কিন্তু ফিরল না আগেকার হর্ণ, রবারের মোটা খোলের বেলুন, যাকে আমরা বলতাম 'ব্যাঁকু হর্ণ'; আওয়াজের জন্য। আগে ট্যাক্সি, লরি, বাস ইত্যাদিতে এই ব্যাঁকু হর্ণ ছিল। তারা বিতাড়িত হয়ে আশ্রয় নিয়েছে সাইকেল রিকসাতে।

আগেকার কালে দুটি জিনিষ প্রায় প্রতি মধ্যবিত্ত গৃহস্থের বাড়ীতে আ'সত। তার একটি ছিল বার্ষিক পাঁজি। কিছু বিবরণ আগে লিখেছি। পাঁজি আজও দেখা যায়, তবে সংখ্যায় ক'মে গেছে। আর একটি জিনিষ প্রায় লুপ্ত হ'তে চলেছে মধ্যবিত্তের ঘরে। হলুদ রঙের, আর্ট পেপারে তৈরী আট ইঞ্চির ম'ত চওড়া আর টিউবের ম'ত পাকানো। টানলে প্রায় পাঁচ-ছ হাতের ম'ত হ'ত। নাম ছিল কোষ্ঠী, যার জন্য ক'রা, তার পক্ষে পড়া নিষিদ্ধ ছিল। এ গুলির প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী ছিল বিয়ের ব্যপারে। এখন আর খুব একটা দেখা যায় না। তবে এর একটি মূল অংশের প্রয়োগ আজও দেখা যায় সম্বন্ধ ক'রা বিয়ের ব্যাপারে। জন্ম ছক, অর্থাৎ জন্ম লগ্নে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান।

বিয়ের ব্যাপারে আরও একটি জিনিষ হারিয়ে গেছে, ঘটক সম্প্রদায়। বহু বিবাহেই দুটি পরিবারের সংযোগ করিয়ে দিত এই ঘটকেরা। খুব কাঁচুমাচু হয়ে তারা গৃহস্থের বাড়ীতে আসত। কন্যার বা পাত্রের রূপ- গুণ যতদূর সম্ভব বাড়িয়ে এবং রূপ তথা গুণের ঘাটতি যতদূর সম্ভব উহ্য রেখে পেশ করত। আমার মনে আছে, এক ঘটক পাত্রপক্ষের কাছে কন্যার রূপ বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিল 'রঙের কথা আর কি বলব, চোখে রঙিন কাঁচ দিয়ে দেখতে হয়’। পাত্রের বাবা দেখে এসে বলেছিলেন 'দেওয়াল ছাড়া আর কিছুই সাদা দেখতে পেলাম না'। এই ঘটকেরা যাতায়াত কম পরিধির মধ্যে রাখত, কারণ, প্রায়ই হেঁটে কাজ করতে হতো। ফলে বেশী ভাগ বিয়েই হত একই গ্রামে, বড়ো জোর পাশের গ্রামে; খুব দূর হলেও একই জেলার মধ্যে। হারিয়ে গেছে চিল, অন্ততঃ কলকাতার আকাশ থেকে। 'সবুজের ছোঁয়া কিনা, তা বুঝি না, ফিকে গাঢ় হরেক রকম' (গানটি শুনতে চাইলে ক্লিক করুন , থামাতে চাইলে আবার ক্লিক করুন )

আমরা মোমিনপুরে থেকেছিলাম দুই পর্যায়ে; প্রথম 58,Bornfield Road, যেটা মূল রাস্তা থেকে একটি একটি গলির মধ্যে খুব বেশী হলে দু'শো ফিটের মতো(ছবি দিলাম) ১৯৪৫-এর শেষ তিনটি মাস থেকে ১৯৫২ জানুয়ারী পর্যন্ত আর ১৯৫৬ দুর্গা পূজো থেকে ১৯৬০ জানুয়ারী পর্যন্ত। আর এই দ্বিতীয় পর্ব ছিল মূল রাস্তার উপরে 62 Bornfield Road । এই দ্বিতীয় বাড়ীর সামনেই দুটো মিষ্টির দোকান ছিল। বহুবার হয়েছে সিঙারা কিনে বাড়ী ঢোকার মধ্যেই নিঃশব্দে মসৃণ গতিতে গ্লাইডার প্লেনের মতো নেমে এসে ছোঁ মেরে ঠোঙা ছিনিয়ে গেছে চিল। কি নির্ভুল লক্ষ্য ও গতির সমন্বয়! যখন ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ ভবানীপুরে প্রিয়নাথ মল্লিক রোডে ছিলাম, তখনও আকাশে চিলের মেলা দেখেছি সকাল, দুপুর ও বিকেলে। আজ তারা হারিয়ে গেছে কলকাতার আকাশ থেকে, আকাশে ঝুলঝাড়া বাড়ীর বাহুল্যে।

সবার আগে মনে আসে, আমাদের এক সময়ের পরিচিত বাংলা ভাষার কথা যা এখন প্রায় অবলুপ্ত হ'তে চলেছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে। বাংলা শব্দপ্রয়োগ এখন শুধু ক্রিয়া পদ ও সর্বনামে সীমাবদ্ধ হ'য়েছে। এইটুকু কৃপা কেন ক'রা হচ্ছে তা বুঝতে পারি না, এ টুকুও তুলে দিলেই হয়। বেশ ভালো ভাবে বোঝাতে হ'লে অবধারিত ভাবে ইংরাজীর আশ্রয় নিই, বোঝানো আর বোঝা অন্যথায় বোঝা মনে হয়। এমন কি, সাহিত্যসেবীরাও এই অভ্যাস থেকে মুক্ত ন'ন। যে ন্যূনতম সাক্ষর, সেও 'সাধারণত' না ব'লে 'নর্মালি' বলে-- 'সমস্যা' না ব'লে 'প্রবলেম'-এর আশ্রয় নেয়-- বাংলা ভাষাটা এমনই দুঃসাধ্য হ'য়ে গেছে হয় তো। এর ফলে দেখা যাচ্ছে আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলতে আদৌ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। বাংলা ভাষায় যুত্সই শব্দ চট করে মনে আসে না-- কথা বলার সময়, ইংরাজী শব্দ লাগিয়ে দিই। তার পরে হঠাৎ মনে পড়ে যায় এখানে বাংলা শব্দ ব্যবহার করা উচিত ছিল এবং হয় তো অনুপযোগী শব্দ ব্যবহার করে বসি। এই সম্প্রতি একটি নামী টেলিভিশন চ্যানেলের নিয়মিত রবীন্দ্রসঙ্গীত অনুষ্ঠানে সুখ্যাত শিল্পী (শিল্পী-দম্পতি অংশগ্রহণ করছিলেন) বললেন, "চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করে চলচ্চিত্র অনেক rich- ধনী হয়েছে"। তাঁর মনে পড়ল না এক্ষেত্রে সব চেয়ে উপযুক্ত শব্দ ছিল সমৃদ্ধ। কে জানে, কোন গুরুর অভিশাপে এমন হয়েছে যেমন মহাভারতে কর্ণ প্রয়োজনের সময় অস্ত্রবিদ্যা বিস্মৃত হয়েছিলেন। এই তো, 2017 28 September বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে 'ছ'টার মধ্যে অনুষ্ঠেয় ' ইচ্ছে নদী' (উচ্ছের মতন তেতো) সেদিনের পর্বে একটি নতুন শব্দ সংগ্রহ হলো- 'থ্রুতে' , আগে হলে শুনতাম 'অমুকের সুবাদে'।

স্বর্গত সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের (এখনকার ভাষায় 'স্বর্গীয়') অশেষ সৌভাগ্য তিনি প্রয়াত, এই সব ভাষা তাঁকে শুনতে হয় নি, নতুবা তাঁর ব্যাকরণবই-য়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক বাংলা ভাষার এই সব উদাহরণেই তাঁর বই এক খণ্ড শেষ হয়ে যেত, আর তিনি গলদঘর্ম হতেন। হায় বাংলা ভাষা, তুমি অচিরেই গবেষকের গরুখোঁজার (গাবেষণা) বিষয় তালিকায় থাকবে সংস্কৃত ভাষার মত। এই রীতিতে চ'ললে বাংলা ভাষার শব্দ ভাণ্ডারে কেবল সর্বনামবাচক আর ক্রিয়াপদবাচক শব্দই অবশিষ্ট থাকবে। (ভুলেই গিয়েছি যে বর্তমান নব্য বাঙ্গালীর অনেকেই বোঝেন না যে 'সর্বনাম' হ'ল যাকে ব'লে 'pronoun' আর 'ক্রিয়াপদ' হ'ল যাকে ব'লে 'verb') তবে তখনও বাত্সরিক মাতৃভাষা দিবসে ঘটা ক'রে গাওয়া হ'বে 'মোদের গরব, মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা'। বক্তা চটাচট হাততালির মধ্যে ব'লবেন-- 'আমাদের মাতৃভাষা বাংলার জন্য আমরা proud feel করি। কত মধুর পারিবারিক শব্দ হারিয়ে গেছে যাদের শুনতে পাওয়া যায় কেবল টেলিভিশনে ধারাবাহিক পারিবারিক নাটকে। এখন 'বটঠাকুর', 'ভাসুর', 'নন্দাই' ইত্যাদি সম্পর্কের একটিই পরিচিতি 'দা'- সহযোগে। 'বর' ব'লা বহুকাল উঠে গেছে 'husband' শব্দের ঠেলায়। 'বধূ' বা 'বৌ' এই দুটি মিষ্টি শব্দের বদলে এসেছে 'wife'। শ্বশুর মশাই'- 'বাবা' ব'লেও সম্বোধন ক'রা হ'ত, স'রে পড়েছে 'uncle' শব্দকে জায়গা দিয়ে। আমি ও আমার গৃহিণী ৪৬ বছর কাটিয়ে দিলাম পরস্পরকে 'শুনছো' বলে ডেকে। কি জানি, এই মধুর সম্পর্ক নাম ধরে ডেকে সাধারণ স্তরে নামাতে ইচ্ছে করে না।

গানের লিঙ্ক ইউ টিউব থেকে নেওয়া।


লেখক পরিচিতি: ১৯৬১ সালে শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রাজুয়েট । কর্ম জীবনের পুরোটাই কেটেছে জেসপ কোম্পানী ও Gullick Dobson-এ। শখের মধ্যে ভালো লেখা পড়া এবং অব্শ্যই পছন্দের গান বারবার শোনা, যার সিংহভাগই উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত- এ ছাড়া ভক্তিমূলক গান, সাড়া জাগানো বাউল ও ভাটিয়ালী, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর ফেলে আসা দিনের আধুনিক বাংলা গান। সময়ের ফাঁকে ফাঁকে লেখালেখি করেন। অবসর-এ ওঁর লেখা রাগসঙ্গীত প্রবেশিকা একটি বহুপঠিত রচনা।                      

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.