অবসর-এ প্রকাশিত পুরনো লেখাগুলি 'হরফ' সংস্করণে পাওয়া যাবে।


বিবিধ প্রসঙ্গ

মে ১৫, ২০১৭

 

আমাদের অদ্ভুত বাড়ি

ইন্দ্রানী ঘোষ

বাড়ি মানে, যেখানে শেকড়-বাকড় গজিয়ে যায়। বাড়ি মানে - পৃথিবীর সেই কোন যেখান থেকে এক অমোঘ অনুভব বিচ্ছুরিত হয় দিকচক্রবালে সন্ধ্যে নামলে, যার নাম টান। এমনি এক জায়গায় আমার শেকড় বসে আছে আজ তেত্রিশ বছর ধরে। দিকচক্রবালে যতই আঁধার ঘনাচ্ছে, সেই টানও বাড়ছে।

সালটা ১৯৮৩। এক সাদামাটা ফ্ল্যাটবাড়ি আমাদের ঠিকানা হল। হ্যাঁ, ৫৪, আর.এন. দাস রোড। কয়েকজন শিক্ষক ও অধ্যাপকদের স্থায়ী ঠিকানা। এ এক অদ্ভুত আস্তানা। নামটাও অদ্ভুত ‘চাণক্যপুরি’। কয়েকজন আধুনিক চাণক্যের আস্তানা। তারপর থেকেই আমাদের, মানে এই মাস্টারমশাইদের পরিবারবর্গের একসঙ্গে পথচলা, একসঙ্গে একান্নবর্তী পরিবার হয়ে, ফ্ল্যাট কালচারে নয়।

পড়াশোনাই একমাত্র এ বাড়ির ‘প্রায়োরিটি’। বাড়িতে গ্যারেজ আছে কিনা, সে বাড়িতে ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যতে গাড়ি কিনে রাখতে পারবে কিনা, তিন কামরার ফ্ল্যাটে একটাই টয়লেট, লোক বাড়লে কী হবে- এসব ভাবার কোনও প্রয়োজন ছিল না। আবার ‘পজিশনওয়াইজ’-ও বাড়িটা সুবিধেজনক নয়, রেললাইন পেরিয়ে যেতে হয়, বর্ষায় হাঁটু-জল ইত্যাদি ইত্যাদি। তা হোক গিয়ে, পড়াশোনা বা সংস্কৃতিচর্চায় তো বাধা নেই! এর ফলে যেটা হয়েছিল, বাড়ির একমাত্র পূজা ছিল সরস্বতী পূজা। আর সেই মা সরস্বতীকে ঘিরেই যত কর্মকাণ্ড।

দোতলার জেঠিমা, মানে আমাদের “অনুমা’, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুর-শাক রাঁধতে রাঁধতে যে কী অনবদ্য চিত্রনাট্য লিখে ফেলতেন, তা অবিশ্বাস্য। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল এই সৃষ্টি-যজ্ঞে বড়রা, ছোটরা সকলেই থাকতাম একসঙ্গে। আমার বাবা সত্যজিৎ রায়-কণ্ঠে ‘ঋতুরঙ্গ’-তে পাঠ করছেন, পরের গান গাইবেন মিকুমামা। গানটি বর্ষার গান, “বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো”। মিকুমামা স্বরলিপি মিলিয়ে হারমোনিয়ামের রিডে ‘বহু’ আর ধরতে পারেন না। গলা দিয়ে “বো বো বো” বেরোচ্ছে। ‘বহু’ আর আসছে না। কী করবে বেচারা! সামনে অত-জন মাস্টারমশাই ও দিদিমণিরা বসে আছেন, পান থেকে চুন খসলেই চোখা চোখা ধমক শুনতে হবে যে। এখনও হাসি পায় ভাবলে।

কেলেঙ্কারি কি আমারও হয়নি? তাও হয়েছে। ‘পূজারিণী’ নাটকে অভিনয় করতে গিয়ে বেনারসি শাড়ি ছিঁড়ে ফরদাফাই। ওদিকে আমার হুঁশ নেই। গরগর করে পার্ট বলে যাচ্ছি। লজ্জাশরম বরাবরই কম আমার। আমাদের বড়দের অভিনীত ‘ভুশুণ্ডির মাঠ’ আর ছোটদের ‘হ য ব র ল’ যেবার হয়েছিল সেবার মেকআপ, ড্রেস সবকিছু এসেছিল। সেই প্রথমবার পেশাদারে মত অভিনয় করা। বিপ্লবদা পণ্ডিত সেজে, টাকে টিকিট এঁটে পার্ট ভুলে এমন কাঁদল, যে কেউ তো কিছু বুঝলই না, উল্টে প্রথম পুরস্কারটিও সে বাগালো!

আমাদের বাড়ি ছেড়ে প্রথম আইআইটি-তে পড়তে যায় বাবুদা। সেইদিন জ্যোৎস্নাকাকিমাকে দেখে বুঝেছিলাম, বাসা ফাঁকা হয়ে গেলে মা পাখির কেমন লাগে। এরপর আমরা একে একে উড়ে গেছি যার ডানায় যেমন জোর, সেই জোরকে ভরসা করে। বাসাগুলো একে একে ফাঁকা হয়েছে। শুধু রয়ে গেছেন প্রাচীন প্রাচীনারা।

আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই আজ প্রবাসী। যারা কলকাতায় আছি, তারাও এমন বাড়িতে চলে এসেছি যেখানে গ্যারাজ আছে। গাড়ি রাখতে হবে যে! আমাদের ছানারাও ডানা ঝাপটাচ্ছে। তারাও এবার উড়ে যাবে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি গাক্কা আর তিত্তি- টুকটুকদির যমজ ছেলেমেয়ে, তারাও তো স্নাতক হয়ে গেল। কথায় আছে, “জন্ম, মৃত্যু, বিয়া, বিধাতারে দিয়া”। আমাদের বাড়ি তো বিধাতার আওতার বাইরে নয়। নিয়ম মেনে সময়ের ঢেউ আছড়ে পড়েছে, তোলপাড় করেছে, ভাঙা-গড়ার খেলা খেলেছে আমাদের আঙিনায়।

আমাদের বাড়ির নীচে কিছুটা খালি জায়গা ছিল। আমরা মজা করে বলতাম, এখানে না রাখা যায় গাড়ি, না করা যায় প্রয়োজনীয় কিছু করা। তাই এই জায়গাটার নাম ‘ঘোড়ার ডিম'। সেটা ছিল ৮৬ সালের বসন্ত পঞ্চমী। আমাদের নীচের সেই ঘোড়ার ডিমের জায়গাটা তখনও মাটির। সিমেন্ট বাঁধাই হয়নি। মা সরস্বতীকে বসানোর আগে সেখানে ঝাঁটা দিয়ে মাটি পরিষ্কার হত। ঝাঁটা দিলে ঝুড়ি ঝুড়ি স্যাঁতস্যাঁতে মাটি উঠে আসত। তা বাগদেবী বসেছেন, পুজো হয়েছে, খিচুড়ি, বাঁধাকপি, বেগুনি, চাটনি সহযোগে রাতের খাওয়া শেষ। বড়রা নীচে ঠাকুর পাহারা দেবেন। তখনো বাড়িতে গেট নেই জুতের। আমাদের বকেঝকে বাড়ি পাঠানো হল। পরদিন সকালের আগে মুক্তি নেই আমাদের। এমন সময় দেখা গেল সমরকাকু (সেইসময় কনিষ্ঠতম সদস্য) কাঁপতে কাঁপতে বেরোচ্ছেন। তা যাবেন আর কোথায়? সামনেই ডাকসাইটে মাস্টারমশাইরা বসে আছেন। অতএব প্রশ্নবাণ ধেয়ে এলোঃ

“কোথায় যাচ্ছ সমর?”
“একটা ট্যাক্সি লাগবে।”
“ট্যাক্সি? কেন?”

কাকিমা, মানে সমরকাকুর স্ত্রী তখন অন্তঃসত্ত্বা। সমরকাকু লজ্জায় বলে উঠতে পারছেন না যে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, সময় উপস্থিত। ফেলুদা-ভক্তরা আন্দাজ করলেন এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় হুকুম দিলেনঃ “তুমি বাড়ি যাও। চেয়ারে করে নামানোর ব্যবস্থা কর। আমরা ট্যাক্সি দেখছি’।

সেই মাঝরাতে তাঁরা কোথা থেকে ট্যাক্সি পেলেন কীভাবে নিয়ে গেলেন, সেসব তো আমরা পরে কল্পনা করেছি। কাকিমা বেচারি ভাশুরদের সঙ্গেই নার্সিংহোম গেলেন। ডাক্তারবাবু এলেন। ডাক্তারবাবু অভয় দিলেন, “মা আছেন”। ইনি আবার মা কালীর ভক্ত ছিলেন। ঘোর অবিশ্বাসী মানুষগুলো তখন কী ভাবছিলেন, কী জানি! একটুও কি বিশ্বাস এসেছিল মনে? যাই হোক কাকিমা ও. টি- তে গেলেন। বাড়ির সকলে বাইরে অপেক্ষারত। সিজারিয়ান সেরে ডাক্তারবাবু বেরলেন। গম্ভীর কণ্ঠে জানালেন, “মহাস্থবির জাতক’ এসেছে। আসলে, সমরকাকুদের ‘আতর্থী’ পদবীটি দেখে উনি আন্দাজ করেছিলেন, এ জাতক প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর বংশধর। এবং বলাই বাহুল্য, আন্দাজটি নির্ভুল। জন্মাল ‘সাগ্নিক’, আমাদের বাড়ির কনিষ্ঠতম সদস্য। আমাদের সবার আদরের ‘ভুতো’।

এই সাগ্নিক জন্মের পর থেকেই জ্যাঠাদের নয়নের মণি। আমার বাবা তাঁর ‘ভালো জেঠু’। সে নিজেই বড় হয়ে এই নাম দিয়েছিল। সে রাতে বাড়ির সকলে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ নিয়ে ফিরেছিল। দাদাদের পিছনে সলজ্জ মুখে সমরকাকু। পরদিন সরস্বতী ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে সমরকাকুর ‘বরপুত্র’ লাভের হাসিটি আজও বেশ মনে পড়ে।

একই আনন্দের প্লাবন নিয়ে এসেছিল গাক্কা আর তিত্তি। টুকটুকদির যমজ ছেলেমেয়ে। আমরা তখন কলেজে পড়ি। সন্ধ্যেবেলা ফিরে শুনলাম, ‘অলকানন্দার পুত্র-কন্যা’ এসেছে। দুটো জ্যান্ত পুতুল ক’দিন পর বাড়ি এল। আর আমাদের পড়াশোনা মাথায় উঠল। একটু বড় হওয়ার পর, তারা হল আমার গল্পের বই একসঙ্গে পড়ার বন্ধু। কত লোডশেডিং হওয়া সন্ধ্যে যে কেটেছে 'সব ভূতুড়ের' পাতায় ডুবে!

আমাদের সেই জলসাঘর ভেঙে গেছে। ও বাড়িতে এখন আছে শুধু সাগ্নিক। ইতিহাসের গবেষক, আমাদের সবার আদরের ভুতো। বাবা, কাকা জ্যাঠাদের ঐতিহ্যর আগুন সেই রক্ষা করছে। বাবা, কাকু, জেঠুরা তো কবেই চির যৌবনের দেশে দূত হয়ে চলে গেছেন।

ও বাড়িতেই একদিন সোনাদি গেয়েছিল, “আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়”। সেই গান আজ সত্যি। সোনাদি এখন কানাডায় অধ্যাপনা করে। সেইখানেই স্বামী-সন্তান নিয়ে স্থিত। ঝর্ণা এখন সিয়াটেলে। সেও সংসার, চাকরি সন্তান নিয়ে গিন্নিবান্নি আজ। ঝর্ণা গেয়েছিল “তোমরা যা বল তাই বল আমার লাগে না মনে”। আমাদের না হল গ্যারাজ, না রইল ঐ ঘোড়ার ডিমের জায়গাটা। ওই বাড়িটাকে নিয়ে কেউ মস্করা করলে এখন আর বোধহয় আমার কিছু যায় আসে না। আমিও ঝর্ণার মতোই বলি- “তোমরা যা বল তাই বল আমার লাগে না মনে...’।

তবে যখন দুঃস্বপ্ন আসে মাঝে মাঝে... আমাদের অদ্ভুত বাড়ির ভাঙা পাঁচিল দিয়ে পথের পাঁচালী-র শেষ দৃশ্যের সাপটা ঢুকে যাচ্ছে, আর পুষ্পেনদার বাঁশিতে বাজছে পথের পাঁচালীর সুরটা... আমার শিরদাঁড়া দিয়েও ঐ সাপটার মত হিলহিলে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায় তখন।

ধড়মড় করে উঠে বসি ঘেমে নেয়ে।


লেখক পরিচিতি : পেশায় শিক্ষিকা। বর্তমানে স্বামী কন্যা-সহ কলকাতায় স্থিত। লেখালিখিতে মুক্তির আশ্বাস খোঁজা এক সামান্য কলমচি হিসেবেই দেখতে চান নিজেকে।                      

 

(আপনার মন্তব্য জানানোর জন্যে ক্লিক করুন)

অবসর-এর লেখাগুলোর ওপর পাঠকদের মন্তব্য অবসর নেট ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়।

Copyright © 2014 Abasar.net. All rights reserved.